লন্ডন আর যুক্তরাজ্যের মানুষ এ বছর বেশ কয়েকবারই সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে, হতাহতের সংখ্যাও কম নয়। একসময় প্রায় পুরো পৃথিবী শাসন করা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আজ আর নেই। কিন্তু এ বছর বারবার সন্ত্রাসী হামলায় রক্তাক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্য । চলুন জেনে নেয়া যাক এ বছরে যুক্তরাজ্যের শীর্ষ পাঁচটি সন্ত্রাসী হামলা সম্পর্কে।

ওয়েস্টমিনিস্টার ব্রিজ, মার্চ ২২

ওয়েস্টমিনিস্টার ব্রিজে পথচারী এবং পুলিশের উপর গাড়ি উঠিয়ে দিয়ে শুরু হয় আক্রমণ। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি এরপর হাউজ অব পার্লামেন্টের দেয়ালে আঘাত করে থেমে যায়। কিন্তু আক্রমণকারী সেখানেই থেমে যায়নি। গাড়ি থেকে নেমে ধারালো ছুরি দিয়ে আক্রমণ শুরু করে পাহারারত নিরাপত্তাকর্মীদের উপর। নির্মম এই ঘটনায় একজন পুলিশসহ পাঁচজন মারা যান, আহত হন ৫০ জনেরও বেশি মানুষ, যারা ১২টি ভিন্ন ভিন্ন দেশের নাগরিক।

আক্রমণকারী খালিদ মাসুদ ঘটনার সময়ই পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। ঘটনার পরপরই আই এস এস খালিদকে তাদের সেনা বলে এ ঘটনাকে নিজেদের সাফল্য বলে দাবি করেন।

ম্যানচেস্টার অ্যারেনা, মে ২৩

লন্ডনের ঘটনার দু’মাস পর আবারও রক্তাক্ত হয় যুক্তরাজ্য, এবার সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যস্থল ছিল ম্যানচেস্টার। আমেরিকান গায়িকা আরিয়ানা গ্রান্ডের কনসার্টে হয় এই হামলা। রাত সাড়ে দশটার দিকে কনসার্ট শেষে ম্যানচেস্টার অ্যারেনা থেকে যখন সবাই বের হচ্ছিল, ঠিক তখনই কনসার্ট হলের বাইরে আত্মঘাতী হামলায় কেঁপে ওঠে ম্যানচেস্টার। এই হামলায় নিহত হন ২২ জন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশুও ছিল। আহত হয়েছিলেন ১২০ জনেরও বেশি।

এ হামলার জন্য দায়ী ছিল ২২ বছর বয়সী সালমান আবেদি নামের একজন ব্রিটিশ নাগরিক। আগের বারের মতোই এবারও আইসিস এ হামলার জন্য নিজেদের দায় স্বীকার করে।

লন্ডন ব্রিজ এবং বোরো মার্কেট, জুন ৩
ম্যানচেস্টারে আত্মঘাতী হামলার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে লন্ডন আবারো শিকার হয় হামলার। এবারও আগেরবারের মতো পথচারীদের উপর গাড়ি উঠিয়ে দিয়ে এবং এরপর গাড়ি থেকে নেমে ছুরি দিয়ে আক্রমণ করে। জুনের ৩ তারিখে রাত ১০ টার দিকে লন্ডন ব্রিজে পথচারীদের উপর ভ্যান উঠিয়ে দিয়ে আক্রমণ শুরু করে।

পথচারীদের উপর আক্রমণ শেষ করে ভ্যান থেকে নেমে আক্রমণকারীরা বোরো মার্কেটের ভেতরে ক্যাফে এবং পাবের লোকদের উপর আক্রমণ শুরু করে ছুরি দিয়ে। প্রায় ১৮ মিনিট ধরে চলা এই আক্রমণে নিহত হন ৮ জন, আহত হন অন্তত ৪৮ জন। এবারো বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকরা শিকার হন হামলার।

এ ঘটনার পেছনে দায়ী ছিল তিনজন- খুররাম ভাট, ইউসুফ জাঘবা এবং রাশিদ রেদোয়ান। তিনজনই পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ঘটনাস্থলে। এবারও এ ঘটনার দায় স্বীকার করে আইসিস।

ফিন্সব্যারি পার্ক মসজিদ, জুন ১৯
লন্ডন ব্রিজ ঘটনার ১৬ দিনের মাথায় আবারো পথচারীদের উপর গাড়ি উঠিয়ে হামলা। এবার আক্রমণের শিকার রমজান মাসে তারাবীর নামাজ পড়ে ঘরে ফেরা মুসল্লিরা। আগের দু’মাসে আইসিস এর হামলার রেশ ধরে ইসলামফোবিয়ার শিকার হয় যুক্তরাজুয়ের অধিবাসীরা। মাঝরাতের এ হামলায় নিহত হন একজন, আহত হন আরো দশজন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, হামলা চালানোর সময় হামলাকারি অসবর্ন “আমি সব মুসলিমকে হত্যা করব” বলে চিৎকার করছিল। লন্ডনের মেয়র সাদিক খান এ ঘটনাকে ‘ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

পারসোনস গ্রিন স্টেশন, সেপ্টেম্বর ১৫
সেপ্টেম্বরের সকালে যখন সবাই অফিস কিংবা স্কুল-কলেজে যাবার জন্য সাবওয়েতে ভিড় করে, ঠিক তখনই পশ্চিম লন্ডনের পারসোনস গ্রিন স্টেশনে ঘটে এক বোমা বিস্ফোরণ। পাতাল ট্রেনে ঘটা এ বিস্ফোরণ আরো একবার রক্তাক্ত করে লন্ডনকে। তবে এবারে কেউ মারা না গেলেও আহত হয়েছেন ৩০ জন।

এসব বড় হামলার বাইরেও যুক্তরাজ্য শিকার হয়েছে আরো বেশ কিছু সন্ত্রাসী ঘটনার। বাকিংহাম প্যালেসের বাইরে এক হামলায় দুজন পুলিশ অফিসার আহত হয়েছিলেন আগস্টের ২৫ তারিখে। সন্ত্রাসী হামলার বাইরেও এ বছর লন্ডনে ঘটে গিয়েছে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। পশ্চিম লন্ডনের গ্রিনফেল টাওয়ারে গত ১৪ জুন মাঝরাতে আগুন লেগে মারা গিয়েছে ৭৯ জন, আহত হয়েছে শতাধিক। মর্মান্তিক এ ঘটনায় ঘরছাড়া হয়েছে অনেক পরিবার। ২০১৭ সাল যেন যুক্তরাজ্য, বিশেষ করে লন্ডনের জন্য অভিশাপ হয়ে রয়েছে।

ভিডিওঃ