বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো মিয়ানমারে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের উপর চালানো অকথ্য নির্যাতন। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, লুন্ঠন করা হচ্ছে ঘরবাড়ি, নির্বিচারে পশুর মতো হত্যা করা হচ্ছে মানুষজনকে, মা-বোনেরা হারাচ্ছে তাদের সম্ভ্রম। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললে প্রথম পাতা আর আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর পৃষ্ঠা জুড়ে থাকছে রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার খবর। টেলিভিশন অন করলে নিচে দিয়ে ভেসে যাওয়া খবর এবং মূল খবরের সময়গুলোতেও থাকছে তাদের নিয়ে আলোচনা।

মঙ্গোলদের অত্যাচারের বর্ণনা তো আমাদেরকে শত শত বছর আগেকার ঐতিহাসিকদের বর্ণনার উপর ভিত্তি করে জানতে হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের ঘটনাগুলো যেন আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে।

বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হচ্ছেন মিয়ানমারের শান্তিতে নোবেল পদক জয়ী নেত্রী অং সান সু চি । নিজ দেশে একটি জনগোষ্ঠীর উপর এমন বর্বরতার বিরুদ্ধে তার ভূমিকা আরো বলিষ্ঠ হওয়া উচিত ছিলো নিঃসন্দেহে। কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে তার অদ্ভুত নীরবতা বিস্মিত করেছে গোটা মানবজাতিকেই। এ ক্ষোভ থেকে অনেকেই দাবি করেছেন তার নোবেল পদকটি কেড়ে নেয়ার জন্য, যদিও নোবেল কমিটির নিয়মানুযায়ী সেটি সম্ভব না।

এবার আসুন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপারে। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, চায়ের দোকান সহ সবখানেই আজ সু কির নিন্দা, তাকে তুলোধুনো করে ছাড়ছে জনগণ। হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে, বিশ্বজুড়ে সু কির যে ভাবমূর্তি ছিলো, সে অনুযায়ী বলা যায় কিছুই করেন নি তিনি রোহিঙ্গাদের উপর চলমান এ হত্যাযজ্ঞ বন্ধে। তবে আরো উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, সু কিকে এখানে সামনে বসিয়ে রেখে আড়ালে যে ব্যক্তিটি রোহিঙ্গা নিধনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অধিকাংশ দেশের সরকারী বিবৃতিতে কিংবা সংবাদে তার নামটিই আসছে না! তিনি আর কেউ নন, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং লাইং। বিশ্ব যখন সু কির চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে ব্যস্ত, তখন পেছনে থেকে ঠিকই নির্দেশ দিয়ে চলেছেন মিন। আসলে তিনি নিজেও যে ঠিক এটাই চাচ্ছেন। সংবাদমাধ্যম থেকে জনগণ, তাবৎ দুনিয়া যখন সু কিকে নিয়ে ব্যস্ত, তখন তার নির্দেশেই যে সেনাবাহিনী অমন জাতিগত নিধনের কাজ চালাচ্ছে, সেদিকে জনতার নজর দেয়ার সময় কোথায়?

সরকারি নানা স্থাপনায় আক্রমণের অভিযোগ তুলে সাধারণ রোহিঙ্গাদের উপর নিজের সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছেন সিনিয়র জেনারেল মিন অং লাইং। গত কিছুদিন ধরে রোহিঙ্গাদের উপর যে দমন-নিপীড়ন অতিরিক্ত মাত্রায় শুরু হয়েছে, তার সূত্রপাত বলা যায় গত আগস্টের ২৫ তারিখ থেকে। মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেদিন শতাধিক রোহিঙ্গা যোদ্ধা বন্দুক, লাঠি ও ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ নিয়ে হামলা চালায় রাখাইন অঙ্গরাজ্যের উত্তরে থাকা পুলিশ পোস্টগুলোতে। এ আক্রমণে মারা যায় প্রতিরক্ষা বাহিনীর ১২ সদস্য। রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরেই নির্যাতিত হয়ে আসছিলো, কিন্তু এরপর থেকেই যেন তাদের উপর সেনাবাহিনীর আক্রোশ লাগামছাড়া হয়ে যায়। রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা, লুন্ঠন, ধর্ষণ ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হতে থাকে।

গুলি, শিরোশ্ছেদ, বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা- এমন কোনোকিছুই বাদ নেই যা করছে না মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এ সবই মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এমনকি নিষ্পাপ, অবুঝ শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না তাদের ক্রোধানল থেকে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার জাইদ রা’আদ আল হুসেইন রোহিঙ্গাদের উপর সামরিক বাহিনীর এ আক্রমণকে তাই উল্লেখ করেছেন “পাঠ্যবইয়ে থাকা জাতিগত নিধনের নমুনা” হিসেবে।

তো অং সান সু কি এই সেনাপ্রধানকে থামাতে কেন পদক্ষেপ নিচ্ছেন না? উত্তর হলো- তিনি নিতে পারবেন না, তার সেই ক্ষমতাই নেই! হুম, অদ্ভুত শোনালেও এ কথাটাই সত্য। সেনাবাহিনী-প্রণীত মিয়ানমারের সংবিধানে সেনাবাহিনীর উপর কোনো ক্ষমতাই দেয়া হয় নি সু কির নেতৃত্বাধীন সরকারকে। জনগণের নির্বাচিত সু কির সরকারের কোনো নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য নয় সেনাবাহিনী। ওদিকে এই সেনাবাহিনী আবার নিয়ন্ত্রণ করছে পুলিশ, সিকিউরিটি সার্ভিস, জেলখানা, সীমান্ত সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়াদি এবং অধিকাংশ সরকারি চাকরি। শুধু তা-ই নয়, সংসদের শতকরা ২৫ ভাগ আসন সংরক্ষিত আছে সেনাবাহিনীর জন্য। মিয়ানমারের সংবিধানের কোনো বিষয়ে পরিবর্তন আনতে চাইলে শতকরা ৭৫ ভাগ সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ২৫ ভাগ যেখানে সেনাবাহিনী একাই নিয়ে রেখেছে, সেখানে বাকি ৭৫ থেকে পুরোটা যে পাওয়া একপ্রকার অসম্ভব, তা তো সহজেই অনুমেয়। ফলে আপনি ধরে নিতে পারেন যে, মিয়ানমারে দ্বিতীয় আরেকটি সরকার আছে, যার প্রধান হলেন মিন অং লাইং, যে সরকার সশস্ত্র ক্ষমতার অধিকারী!

বোঝাই যাচ্ছে যে, মিনের নেতৃত্বাধীন ভূমিকাই বরং এখানে বেশি খলনায়কসুলভ। এ কথা ভুলেও ভাবতে যাবেন না যে, মিনের উপর দায় চাপিয়ে সু কিকে শান্তির দূত বানাতে চাচ্ছি ! সু কির ভূমিকা যে মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ, যা আশা করা হয়েছিলো তার ধারেকাছেও নেই, সেটা তো আগেই বলা হয়েছে। তবে আমরা যখন কেবল সু কিকে নিয়ে মেতে আছি, তখন রোহিঙ্গাদের হত্যায় পর্দার পেছনে কলকাঠি নেড়ে যাওয়া ব্যক্তি যে আসলে আরেকজন, সেটাই বলা হলো।

বিশ্বমানবতার মানবাত্মা জেগে উঠুক, অবসান হোক রোহিঙ্গা সহ বিশ্বের সকল নির্যাতিত জনগণের উপর চলমান বর্বরতার, জয় হোক বিশ্বের কল্যাণকামী মানুষের- এ প্রত্যাশায় আজকের লেখার ইতি টানছি এখানেই।