১৯৪৮ সালের স্বাধীন বার্মার/মিয়ানমারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জেনারেল অং সানের মেয়ে অং সাং সূচী (বর্তমানে, ঢাবি এর বড় ভাই নয়ন ভাই যাকে “পলিটিকের পোস্টিটিউট বলে আখ্যা দিয়েছেন) ২০১৬-১৭ সালের নির্বাচনে যখন মিয়ানমারের সাংবিধানিক জটিলতার কারণে তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পরও সূচি কে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি (বর্তমানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) তখন আমাদের কাছে খুব আফসোস লেগেছিল, কারণ তখন ধারণা করা হয়েছিল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী ও শান্তিতে নোবেল জয়ী (যদিও বাস্তবে নরপিশাচ) সূচীর দল ক্ষমতায় আসলে ১৯৭৮ সালে থেকে ঘটে আসা আরকান রাজ্যের রোহিঙ্গাদের উপর নোংরা নির্যাতন, ভিটেমাটি উ”েছদ করা বন্ধ হবে এবং মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার ফিরে পাবে। কিš‘ তার দল সেনাবাহিনীর সাথে সমঝোতা করে ক্ষমতা চালালেও সেই রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান তো হয়নিই বরং নতুন করে ২৫ আগস্ট ২০১৭ রাতে আরকান রাজ্যের বিদ্রোহী সংগঠন “আরকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি” সংক্ষেপে ‘আরসা’ মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশ ক্যা¤েপ হামলা চালালে, বাস্তবে এই অভিযোগের কোন সতত্য যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়ে এর জেরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কমপক্ষে ১০০ রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে, দেখা মাত্র গুলি করেছে, লাশ হয় নদীতে ভাসিয়ে দি”েছ না হয় পুড়িয়ে দি”েছ।

এবার আসা যাক বাংলাদেশ প্রসঙ্গে, বাংলাদেশের দুইটি প্রধান রাজনৈতিক দল একে অন্যকে দোষারোপ করছে রোহিঙ্গা ইস্যুর ব্যর্থতা নিয়ে, বিরোধী দল বলছে সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা, আবার সরকারী দলও রোহিঙ্গা নিয়ে নোংরা রাজনীতি করতে নিষেধ করতেছে। কিš‘ প্রশ্ন হলে প্রথমত, এটা কোন নতুন সমস্যা নয় ১৯৭৮ সাল থেকে এ সমস্যা বয়ে আসছে, দ্বিতীয়ত আমি যদি বলি আমার বাড়ি থেকে আমার ছেলেমেয়েকে নির্যাতন করে বের করে দিতে চাই তা হলে প্রতিবেশীর কি তা থামাতে পারবে? তৃতীয়ত, মিয়ানমারকে কূটনৈতিক চাপ দেওয়ার তেমন খুব বেশি সুযোগ বাস্তবে নেই, কারণ প্রথমত. মিয়ানমারের সাথে চীনের স¤পর্ক অত্যান্ত ঘনিষ্ঠ, মিয়ানমার অসুবিধায় পড়–ক এমন কিছু চীন করবে না, ভারতও মিয়ানমারকে চটাতে চায় না তা মোদির সফর ও বক্তব্য শুনলে সহজে বোধগম্য হয়। দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক চাপ দিয়ে সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনা আরো ক্ষীণ হওয়ার কারণ হলো, মিয়ানমার বহুদিন জাতিসঙ্গকে তোয়াক্কা করে না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তো যে কোন বিষয়েই পাত্তা দেয় না। পশ্চিমা ইউরোপের দেশগুলোকে মিয়ানমার তার গার্লফ্রেন্ড মনে করে, প্রতিবেশী আশিয়ান রাষ্ট্রগুলোও মিয়ানমারকেও বাংলাদেশের চেয়ে বেশী আপন মনে করে তা যদি আমরা না বুঝতে পারি তাহলে তা আমাদের পোড়া কপাল, জাপান কোরিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের স¤পর্ক ঐতিহাসিক, পুরোনো ও বিস্বস্ত¡, চীন তো তাদের জন্মদাতা পিতা । তৃতীয়ত, মিয়ানমারের বেসামরিক ছদ্মাবরনে মূল শাসন চালা”েছ সেনাবাহিনী আর সেনাবাহিনী হলো উগ্রপš’ী তারা কূটনৈতিক সমঝোতার চেয়ে অস্ত্রের সমঝোতা বেশী পছন্দ করে।এখন বাংলাদেশ পড়েছে উভয় সংকটে, মানবতার দিকে তাকাতে গিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জাতীয় সমস্যাকে বাড়িতে তুলবে নি:সন্দেহে। অসহায় রোহিঙ্গা শিশু-নারী নদীতে ভাসতে দেখে, মানবতার চরম অপমান ও লাঞ্ছনা দেখে আমরাও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রার্থনা করছি ও আকুলি বিকুলি করছি, কিš‘ এ সমস্যার আন্তর্জাতিক ভাবে কোন সমাধান না হলে, আমাদের বাংলাদেশও সংকটের মধ্যে পড়বে, বেকারত্বে জর্জরিত আমাদের দেশ অতিরিক্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের ভরন পোষন চালানো ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টাও ভাবনার বিষয়।বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ হলে এমন এক ইস্যু যার পক্ষে দাড়ানোর মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। রোহিঙ্গাদের আগে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হতো আর এখন পুলিশ ফাড়িঁতে হামলা করায় বলা হবে জঙ্গি, ব্যাস এ রোহিঙ্গারা যখন দীর্ঘদিন ধরে লা না ও ব নার শিকার তাতে তাদের দিয়ে উগ্রবাদী কাজ করানো খুবই সহজ। তারপর আবার দেখা যা”েছ, এ লক্ষ লক্ষ ভাসমান রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার সরকার ফিরিয়ে নেয়ারও কোন বাস্তব পদক্ষেপ এর লেশমাত্রও দেখা যা”েছ না। এতে ¯পষ্ট দেখা যা”েছ বিষয়টা বাংলাদেশের জন্য খালকেটে কুমির আনার মত বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে পারে, মানবিক কারণে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে কিš‘ এর শেষ কোথায় কেউ জানে না, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে অব¯’ান করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশেই আছে ৭ লাখের মতো (পুরাতন রোহিঙ্গাসহ)। বানের স্রোতের মত রোহিঙ্গারা যেভাবে আসছে তাতে ১০ লাখ ছাড়াতে পারে। -এ পরি¯ি’তিতে সারা বিশ্ব লোক দেখানো অশ্র“ বিসর্জন দিলেও আন্তর্জাতিক ভাবে কার্যকরী পদক্ষেপ এর কোন আশার বাতি জ্বলছে না। মিয়ানমার একটি নিষ্ঠুর দেশ। সেই সাথে নারী যখন নিষ্ঠুর হয়, তখন ভয়ংকর রূপ ধারন করে, সূচিরও হয়েছে তাই। বিশ্ব আজ না হোক কাল সূচীকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার লক্ষ লক্ষ ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করেছিল আজ তার দেশ একই নিষ্ঠুরতা চালা”েছ। এখন সমাধানের পথ হলো, সার্বিক বিষয় নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে আমাদের, কোন উসকানিতে পা রাখা যাবে না, একই সঙ্গে সরকারকে দ্রুত নিবন্ধনের ব্যব¯’া করতে হবে। এবং আন্তর্জাতিক ভাবে জাতিসঙ্গ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র সমূহকে এ সংকট নিরসনে সময়পযোগী ও যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমেই এ সংকট নিরসন করতে হবে।আর আমাদের দেশে এটা জাতীয় সংকট। তাই এ সংকট নিরসনে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভূমিকা রাখতে হবে। এ সমস্যা নিয়ে কোন পক্ষরই রাজনীতি করা উচিত হবে না।

পরিশেষে, রোহিঙ্গাদের বেচেঁ থাকার অধিকার কেড়ে নিয়ে মিয়ানমার শান্তিতে থাকতে পারেনা এ বার্তা তাদেরকে দিতে হবে বিশ্বজনমত সংগঠিত করে। এবং রোহিঙ্গা শরর্ণাথীদের আশ্রয়, খাদ্য, নিরাপত্তা যেমন দিতে হবে, তেমনি তারা যাতে নিজ দেশে মর্যাদা নিয়ে ফিরে যেতে পারে সে জন্য কূটনৈতিক তৎপরতার জোরদারও অব্যাহত রাখতে হবে।

 

লেখক,
সভাপতি- বাংলাদেশ ল’ এন্ড জুরিস্ট এসোসিয়েশন (ব্লাজা)