স্ত্রী কীভাবে স্বামীকে তালাক দিতে পারে?

একজন স্ত্রী যখন ইচ্ছা তখন স্বামীকে তালাক দিতে পারেন না। মুসলিম আইনে স্বামীকে তালাক দেয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রী সীমিত অধিকার ভোগ করেন।
নিম্নে লিখিত যেকোন উপায়ে একজন স্ত্রী তালাক সম্পন্ন করতে পারেন।

 ক. স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন।
খ. তালাক-ই-তৌফিজ এর মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন।
গ. খুলা-র মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন।
ঘ. স্বামী-স্ত্রী দুজনই মুবারাতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন।

১. ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী একজন স্ত্রী কী কী কারণে স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারে?

> চার বছর যাবৎ স্বামী নিরুদ্দেশ থাকলে বা কোন খোঁজ খবর না নিলে।
> ২ বছর যাবৎ স্ত্রীর খোরপোষ প্রদানে অবহেলা বা ব্যর্থ হলে।
> স্বামী ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করলে।
> স্বামী ৭ বছর বা তার বেশী সময়ের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে।
> স্বামী কোন যুক্তি সম্মত কারণ ছাড়া ৩ বছর ধরে দাম্পত্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে।
> বিয়ের সময় স্বামী পুরুষত্বহীন থাকলে এবং তা মামলা দায়েরের সময় তা পর্যন্ত বজায় থাকলে।
> স্বামী ২ বছর ধরে অপ্রকিতস্থ থাকলে অথবা কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্থ বা মারাত্মক যৌনরোগে আক্রান্ত থাকলে।
> ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে অর্থাৎ নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে হয়ে থাকলে এবং ১৯ বছর হওয়ার আগে বিয়ে অস্বীকার করলে তবে এক্ষেত্রে স্বামীর সাথে দাম্পত্য মিলন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকলে মামলা করা যাবে না।
>নিম্নলিখিত যে কোন অর্থে স্বামী স্ত্রীর সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করলে –

ক. স্বামী যদি স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে থাকেন।
খ. স্বামী খারাপ চরিত্রের মেয়েদের সাথে মেলামেশা করলে কিংবা নৈতিকতা বর্জিত জীবনযাপন করলে।
গ. স্ত্রীকে জোর পূর্বক নৈতিকতা বিহীন জীবন যাপনের জন্য বাধ্য করার চেষ্টা করলে।
ঘ. স্ত্রীর অমতে তার সম্পত্তি হস্তান্তর করা কিংবা স্ত্রীকে তার সম্পত্তির ওপর বৈধ অধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়া।
ঙ. স্ত্রীকে তার ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনে বাধা দিলে।
চ. যদি স্বামীর একাধিক স্ত্রী থাকে এবং পবিত্র কুরানের নির্দেশ অনুসারে স্বামী তাদের সাথে সমান ব্যবহার না করে।
> মুসলিম আইনে স্বীকৃত অন্য যে কোন যুক্তি সঙ্গত কারণের জন্য মামলা করতে পারেন।

২. তালাক-ই-তৌফিজ

   কাবিন নামার ১৮ নং কলামে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে বিয়ে বিচ্ছেদের ক্ষমতা দেয়াকে তালাক-ই-তৌফিজ বলে। এই তালাক-ই-তৌফিজ এর ক্ষমতা দেয়া থাকলে স্ত্রী আদালতের আশ্রয় ছাড়াই স্বামীকে তালাক দিতে পারেন। এক্ষেত্রে স্বামীর মতোই স্ত্রী তালাকের নোটিশ চেয়ারম্যান এর কাছে পাঠাবেন। নোটিশ প্রাপ্তির ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে।

৩. খুলা –

    খুলা তালাক হলো স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর দাম্পত্য অধিকার থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রস্তাব।এক্ষেত্রে স্ত্রী কোন কিছুর বিনিময়ে স্বামীকে বিচ্ছেদের বিষয়ে রাজী করানোর চেষ্টা করবেন। স্বামী রাজী না হলে এভাবে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। বিচ্ছেদের উদ্যোগ অবশ্যই স্ত্রীর কাছ থেকে হতে হবে।

৪. মুবারাত –

    স্বামী – স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে বিয়ে বিচ্ছেদ সম্পন্ন হলে তাকে মুবারাত বলে। যখন স্বামী – স্ত্রীর মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদের ইচ্ছাটি পারস্পরিক হয় তখন একপক্ষ প্রস্তাব করে এবং চুক্তির মাধ্যমে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। যিনি বিয়ে বিচ্ছেদের প্রস্তাব দিবে তিনিই নোটিশ পাঠাবেন।

স্বামী কীভাবে স্ত্রীকে তালাক দিতে পারবেন?

  একজন মুসলিম পূর্ণ বয়স্ক সুস্থ মস্তিষ্কের পুরুষ যে কোন সময়ে স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন। কিন্তু সে মুখে বা লিখে যেভাবে তালাক দিক না কেন তা সাথে সাথে কার্যকর হবে না।
১৯৬১ সালের পারিবারিক আইন অধ্যাদেশর ৭(১) ধারা অনুযায়ী যে ব্যক্তি তালাক দিবেন তিনি লিখিত ভাবে তালাকের নোটিশ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান / সিটি কর্পোরেশন বরাবরে ও স্ত্রীর কাছে এক কপি নোটিশ পাঠাবেন।

> নোটিশ না পাঠালে ১ বছর কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

> নোটিশ পাওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান/মেয়র শালিসী পরিষদ গঠন করে উভয়ের মধ্যে সমঝোতা আনার চেষ্টা করবেন।

> শালিসী পরিষদ উভয়কে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতি ৩০ দিনে একটি নোটিশ করে মোট ৩ টি নোটিশ প্রদান করবেন। এর মধ্যে স্বামী নোটিশ প্রত্যাহার না করলে তালাক কার্যকর হবে।স্বামী নোটিশ প্রত্যাহার  করলে তালাক কার্যকর হবে না।

> তালাক প্রদানের সময় স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে তালাক কার্যকর হবে না।তবে সন্তান প্রসব হওয়ার পর পর্যন্ত নোটিশ বহাল থাকলে সন্তান জন্ম নেওয়ার ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে।স্বামী নোটিশ প্রত্যাহার করে নিলে এক্ষেত্রে তালাক কার্যকর হবে না।

> ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের অধ্যাদেশের কোথাও নোটিশ প্রদান না করলে তালাক হবে না এ কথা উল্লেখ নেই। তবে স্বামী শাস্তি পাবেন।

> স্বামী কর্তৃক তালাকের ক্ষেত্রে স্বামী যখন ইচ্ছা তখন একতরফা ভাবে তালাক প্রদান করতে পারে। তাকে তালাকের কারণ দেখাতে হয়না। কেন স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিলেন তা স্ত্রী জানতে চাইতে পারেন না। এটা স্বামীর একতরফা ক্ষমতা।

লেখক: রাশিদা চৌধুরী নীলু ,   আইনজীবী।