আধুনিক এ সমাজে কুসংস্কারের খুব একটা স্থান নেই, অন্তত চলতি সময়ে তো অবশ্যই নয়! তবে ইতিহাসের বিশাল এক অধ্যায়জুড়ে গোটা বিশ্বে বিভিন্ন সমাজ এবং সংস্কৃতির পুনর্বিন্যাসে বিশেষ ভূমিকা পালন করে এসেছে কুসংস্কার। তার মধ্যে থেকেই কয়েক টি কুসংস্কারে কথা নিয়ে  আজকের  আয়জনে।

চুইংগাম নাকি মরা মানুষের মাংস

চুইংগাম নিয়ে তুরস্কে আছে এক অদ্ভুত কুসংস্কার। সেখানকার অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন, রাতে চুইংগাম চিবানোর মানে হচ্ছে মরা মানুষের মাংস চিবানো। তাই তুরস্ক ভ্রমণে যাওয়ার আগে সাবধান। জনসম্মুখে রাত-বিরাতে চুইংগাম মুখে দেবেন না! তারা আবার বিরূপ ধারণা করে বসতে পারে আপনাকে নিয়ে।

আয়নাবন্দী 

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অত্যন্ত দরকারি একটি বস্তু হচ্ছে আয়না। এই আয়নাকে ঘিরেও বেশ কিছু লোমহর্ষক কুসংস্কার জড়িয়ে আছে। প্রাচীনকালে অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করতেন, আয়নার ভেতরে লুকিয়ে আছে অলৌকিক কোনো এক শক্তি। সেই শক্তির বলে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকা ব্যক্তির আত্মা মুহূর্তের মধ্যে আয়নাবন্দি হয়ে যায়। এই কুসংস্কার স্রেফ লোকমুখেই আবদ্ধ থাকেনি, জার্মানিতে এ নিয়ে রয়েছে এক বিখ্যাত উপকথা ‘স্নো হোয়াইট’। সেই গল্পের দুষ্টু রানীও আয়না ব্যবহার করতেন। সেই আয়নার মাঝে বন্দি ছিল এক আত্মা, যে রানীর বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতো এবং রানী সেই আয়নাকেই ব্যবহার করতেন স্নো হোয়াইটের ক্ষতি করার জন্য।

আয়নার কি তাহলে আসলেই কোনো অশুভ শক্তি আছে ?

ছায়াশ্বাপদ

বিড়াল নিয়ে কুসংস্কার আছে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই। বিশেষ করে কালো বিড়াল মানেই যেন অনেকের কাছে দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। এই কুসংস্কারটির উৎপত্তি হয়েছে মধ্যযুগীয় এক ভুল ধারণা থেকে। সেই সময়কার মানুষ মনে করতেন, যেসব অবিবাহিত নারী বিড়াল নিয়ে মেতে থাকতেন, তারা আসলে এক জাতের ডাইনী এবং তারা নিজেদেরকে বিড়ালে রূপান্তর করতে পারে!

তাছাড়া এখনও অনেকে বিশ্বাস করে, ডাইনীরা যেসব প্রাণীদের সাথে কথা বলতে পারে, বিড়াল তাদের মধ্যে প্রধান। কালো বিড়ালকে সবচেয়ে খারাপ বলে মনে করার আরেকটি কারণ হলো, লোকে ভাবতো এর রয়েছে স্বয়ং শয়তানের আত্মা ধারণ করে রাখার ক্ষমতা!

হাত চুলকালে টাকা আসে

হাতের তালু চুলকানো নিয়ে আছে বিচিত্র কিছু কুসংস্কার। কেউ বিশ্বাস করেন, যাদের হাতের তালু চুলকায়, তারা সাধারণত লোভী হয় কিংবা অর্থের জন্য রয়েছে তাদের অতৃপ্ত বাসনা। অনেকেই মনে করেন, ডান হাতের তালু চুলকানোর মাঝে লুকিয়ে থাকে অর্থহানির আশঙ্কা আর বাম হাত চুলকালে অর্থপ্রাপ্তি!

নিষিদ্ধ তেরো

তেরো সংখ্যা নিয়ে মানুষের এত ভয় কেন? কখনও ভেবে দেখেছেন এর সূত্র কোথায়? আমাদের উপমহাদেশ তো বটেই, এমনকি পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই বেড়ে উঠেছেন তেরো সংখ্যার প্রতি অজানা ভয় নিয়ে। তবে এর একটি প্রাচীন উৎস রয়েছে। এই ভয়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ধরা হয় ‘দ্য কোড অফ হামুরাবি’ গ্রন্থকে। বিশ্বের প্রথম আইন বই হিসেবে পরিচিত প্রাচীন এই পুস্তকের তেরো নম্বর আইনটি বাদ দেওয়া হয়েছিল কেরানীর ত্রুটির কারণে এবং সেই সময় থেকেই তেরো সংখ্যাকে অপয়া বলার রীতি চলে আসছে।

এখন তেরো সংখ্যাটি নিয়ে কুসংস্কার রয়েছে পৃথিবীর প্রায় সব দেশে। তেরো নিয়ে মানুষের ভয় এতোটাই প্রবল যে, এ নিয়ে তৈরি হয়েছে ফোবিয়া। এই ফোবিয়ার কারণেই অনেক আর্কিটেক্ট কখনো তেরো ধাপের সিঁড়ি কিংবা তেরো তালা দালান বানাতে চান না।

এরকম আরও নানা রকম কুসংস্কার চালু আছে আমাদের সমাজেও। যেমন, মইয়ের নিচে দিয়ে কখনও যেতে হয় না অথবা ঘরের ভেতরে ছাতা মেলা অমঙ্গলজনক। প্রচলিত এই কুসংস্কারগুলো অবশ্যই প্রকৃত সত্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়নি। এগুলো দৃঢ়তা পেয়েছে মানুষের মনের ভয়ের উপর ভর করেই। আজকের যুগে যখন বিজ্ঞান মানুষকে দেখাচ্ছে দূর মহাকাশের দৃশ্য, যখন অজানা পৃথিবীর যাবতীয় রহস্য ভেদের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজ্ঞান চর্চা; তখন এসব কুসংস্কারের ঠাঁই হওয়া উচিত কেবলই ইতিহাসের পাতায়, মানুষের অজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে।

ভিডিওঃ