বাংলাদেশের সংবিধানে এ পর্যন্ত ১৬টি সংশোধনী আনা হয়েছে । বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে এসকল সংশোধনী আনা হয় । যাইহোক আমরা আলোচনা্ করব বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী নিয়ে ।
১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই সংবিধানের প্রথম সংশোধনী পাশ করা হয় । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত বন্দী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি ও তাদের সহযোগীদের বিচারের জন্য এই সংশোধনী পাশ করা হয় । এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৪৭(৩) ও ৪৭(ক) নামক অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয় ।

সংযোজিত ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয় যে,সংবিধানে যেটাই থাকে না কেন যারা কোন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য অথবা যুদ্ধবন্ধি এ সমস্ত লোকদেরকে তাদের গণহত্যাজনিত অপরাধ,মানবতাবিরোধী অপরাধ,যুদ্ধাপরাধ অথবা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অন্যান্য অপরাধে অপরাধী তাদের আটক,দণ্ডদান কিংবা ফৌজদারীতে সোপর্দ করার বিধান সংক্রান্ত বিচার করার জন্য সংসদ যেকোন আইন প্রণয়ন করতে পারবে এবং উক্ত প্রণীত আইন সংবিধানের পরিপন্থি হলেও বাতিল ঘোষণা করা যাবে না

সংযোজিত ৪৭(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয় যে, উক্ত অপরাধী ব্যক্তি নিম্নলিখিত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন-
১.আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার (অনুচ্ছেদন ৩১)
২.protection against trial under Ex-post facto legislation. অনুচ্ছেদ-৩৫(১)
৩.স্বাধীন ও নিরেপেক্ষ আদালতে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকার. অনুচ্ছেদ-৩৫(৩)                                                                                           ৪.মৌলিক অধিকার বলবৎকরণের অধিকার. অনুচ্ছেদ-৪৪

        পর্যালোচনা:
কেন সংবিধনে এরূপ সংশোধনী আনয়ন করা হলো তা জানার আগে আমাদের মূল সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষাকবচ সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে । সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদে বিধান ছিলো,’যে কাজটি যখন করা হলো যা প্রচলিত আইনে অপরাধ নয়,পরবর্তী সময়ে আইন পাশ করে সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে কোন ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান করা যাবে না ।’ আর স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আটককৃত পাকিস্তানি সৈন্য ও এদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্যকারী স্বাধীণতাবিরোধী বাঙালীদের যুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত হত্যা ,লুণ্ঠন,ধর্ষ্ণ,অগ্নিসংযোগ,ধর্মান্তরিতকরণের মতো যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য এদের বিচারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় । এদের বিচারের বাধা ছিলো আমাদের দেশে এমন কোন আইন ছিলো না যার মাধ্যমে তাদের যুদ্ধকালীন সময়ে উপরোক্ত অপরাধের বিচার করা যায় । অর্থ্যাৎ সেগুলো আইন অনুযায়ী অপরাধই ছিলো না ।কিন্তু পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩সালে আইন পাশ করে ঐ ১৯৭১ সালের কাজগুলো অপরাধ ঘোষণা করে বিচারের ব্যবস্থা করা করবে এবং ঐ আইন মূল সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদের পরিপন্থি হবে। আবার সংবিধান পরিপন্থি আইন প্রণয়ন করলে সেটা বাতিল হবে ।তাহলে কি উপায়? সংবিধান সংশোধন করতেই হবে ।
প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে বিধান করা হলো যে, সংবিধানের ৩৫(১)অনুচ্ছেদে যা বলা আছে তা ঠিকই থাকবে,তবে সংযোজিত অনুচ্ছেদ ৪৭(৩) যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে তার ক্ষেত্রে ৩৫(১) অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে না ।

আমাদের পর্যালোচনা থেকে বলতে পারি সংবিধানের প্রথম সংশোধনীটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ্ ছিলো । কেননা সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর পূর্বে স্বাধীনতা সংগ্রামে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হলে retrospective effect দিয়ে আইন পাশ করতে হতো যা আমাদের সংবিধানের পরিপন্থি।

মওদুদ আহমদ
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ঢাক ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি