রক্ত হিম করা চিৎকারে চমকে উঠলো না কেউ! নিঃশব্দে, একেবারে নীরবে সারা গেছে কাজটা। নির্জীব দেহখানার খোলা চোখে এখনো বিস্ময়-আতঙ্ক মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে হালকা হতে শুরু করলো রক্তের ধারা, সেই সাথে খেই হারালো ঘটনার একমাত্র সাক্ষী- শেষরাতের ম্লান আলো ছড়ানো চাঁদ। প্রশান্তির সাথে লম্বা পা ফেলে এগিয়ে চললো ছায়ামূর্তি। খুব শীঘ্রই খুঁজে নিতে হবে পরবর্তী শিকারকে…।

নাটক, সিনেমা কিংবা গল্পে এরকম দৃশ্যের হরহামেশাই দেখা পাই আমরা। এই সকল ঘটনা নানা গল্পে, নানা সিরিজে রকমারিভাবে ফুটে উঠেছে এবং এগুলো একটি বিষয়কে ঘিরেই আবর্তিত। আর তা হলো সিরিয়াল কিলিং বা ক্রমহত্যা। বিশ্বের নানা প্রান্তে আজ অবধি প্রচুর সিরিয়াল কিলারের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের বর্বরোচিত আচরণে কেউ বা চমকে ওঠে, কারো বা গায়ে কাঁটা দেয়। তেমনি বাংলাদেশেও সন্ধান পাওয়া গেছে কয়েকজন সিরিয়াল কিলারের- যাদের কেউবা প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে, আবার কেউ প্রতিপত্তির লোভ ও অন্যান্য কারণে বেছে নিয়েছেন এই ঘৃণ্য খুনের  নেশাকে। তাদের কয়েকজনকে নিয়েই সাজানো আজকের এই ভিডিও টি।

রসু খাঁ

প্রেমে প্রতারিত হয়ে শপথ নিয়েছিল এই ব্যক্তি- খুন করবে ১০১ জন নারীকে, এরপর বাকি জীবন কাটিয়ে দেবে সুফি হিসেবে! ভাগ্য অতটা সুপ্রসন্ন হয়নি এই ক্রমিক খুনির ওপর। ২০০৯ সালের ৭ই অক্টোবর ধরা পরার আগে তার সর্বশেষ শিকার ছিল এগারোতম। দুধর্ষ এই খুনির সিরিয়াল কিলিংয়ের গল্প জানতে হলে তার অতীত থেকে একটু ঘুরে আসা যাক।

রশিদ খাঁ তথা রসু খাঁর জন্ম চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানার মদনা গ্রামে। ক্ষেতমজুর আবুল হোসেন ওরফে মনু খাঁ তার বাবা ছিলেন, যার মৃত্যুর পর তার পরিবার অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। এ সময় সে ছোটখাট চুরির সাথে জড়িয়ে পড়ে। তার মা সহ অন্যান্য পরিবার সদস্যরা নানাদিকে আলাদা হয়ে গেলে ভবঘুরের বেশে টঙ্গী আসে সে। বিয়ের সময় ঘটক তাকে পাত্রী দেখতে না দেয়ায় বিয়ের পর সে জানতে পারে তার স্ত্রীর একটি চোখ নষ্ট। বছর দুয়েক পর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে শশুরবাড়ি রেখে শ্যালিকা রিনা বেগমকে বিয়ে করে টঙ্গী নিয়ে আসে সে। দ্বিতীয় স্ত্রী রিনা গার্মেন্টসে কাজ নেয়। এদিকে সে জড়িয়ে যায় চুরির মতো অপরাধ কর্মকাণ্ডে।

স্ত্রী তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ নেয়ায় রসুর সাথে সেখানে কর্মরত অনেক নারীর পরিচয় হয়- যাদের একজনের সাথে তার প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সে মেয়েটি তাকে রেখে অন্য একজনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে গেলে এর প্রতিবাদ করে সে এবং ফলশ্রুতিতে ঐ নারীর ইন্ধনে তার প্রেমিকসহ কয়েকজন তাকে বেদম মারধর করে। সেদিনই রসু খাঁ প্রতিজ্ঞা নেয়, ১০১ জন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করবে সে।

এরপরই পরিকল্পনামাফিক এগোতে শুরু করে সে। সাভার ও টঙ্গী থেকে প্রেমের অভিনয় করে নানাভাবে নিম্নবিত্ত নারীদের চাঁদপুরে নিয়ে আসে সে। এরপর প্রায় সবাইকেই ধর্ষণের পরে হত্যা করে। তার নৃশংসতার শিকার প্রায় সবাই ছিল গার্মেন্টসকর্মী। হত্যার শিকার অধিকাংশ নারীরই লাশ অজ্ঞাতপরিচয় রয়ে গেছে। হত্যার পর সে লাশ পানিতে ফেলে দিতো অধিকাংশ সময়। কখনো নারীদের হাত-পা বেঁধে পানিতে চেপে ধরে রাখতো যতক্ষণ না তাদের মৃত্যু হয়। টাকার বিনিময়ে কোনো গৃহবধূ ও নারীকে হত্যার সুপারিশ পেলে সে তা-ও সানন্দে গ্রহণ করতো।

২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ৯ তারিখ ফরিদগঞ্জের গোবিন্দপুর ইউনিয়নের হাঁসা গ্রামে সঙ্গী ইউনুস ও শাহীনের প্ররোচনায় একইভাবে এক নারীকে হত্যা করে এবং পরবর্তীতে বন্ধু মানিকের স্ত্রীর প্ররোচনায় অন্য একজন নারীকে ঐ একই গ্রামে নির্যাতন শেষে হত্যা করে ডোবায় ফেলে দেয়। এমনকি তার শিকার হিসেবে তার শ্যালকের স্ত্রীর কথাও শোনা যায়। সে এবং তার শ্যালক আব্দুল মান্নান মিলে মেয়েটিকে ২০০৭ সালের ১৯শে জুন ফরিদগঞ্জের ৯ নং ইউনিয়নের ভাটিয়া গ্রামে নদীর পাড়ে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে জলে ফেলে দেয়।

তার ১১ শিকারের অন্যতম একজন খুলনার দৌলতপুরের সজলা গ্রামের সাহিদা বেগম। ১৯ বছরের পোশাককর্মী সাহিদা বেগমের সাথেও ছলনার আশ্রয় নেয় সে, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে চাঁদপুরে নিয়ে এসে ধর্ষণের পর খুন করে লাশ ফেলে পালিয়ে যায় সে। এ ঘটনাটি ২০০৮ সালের। তার সর্বশেষ শিকার পারভীন আক্তার। গাজীপুরের একটি বাজারে তিন সন্তানের জননী পারভিনের সাথে রসুর পরিচয় হয়। পরিচয় ধীরে ধীরে প্রণয়ে গড়ালে সে তাকে ফরিদগঞ্জের হাঁসা গ্রামে নিয়ে যেতে চায়। এরপর ২০০৯ সালের ৭ জুলাই ভাগ্নে জহির, সে ও সঙ্গী ইউনুস মিলে পারভীনকে নির্যাতনের পর মুখে কাপড় গুঁজে হাত-পা বেঁধে গলা টিপে হত্যা করে পার্শ্ববর্তী খালে ফেলে দেয়। এরপর রিকশাচালক পরিচয়ে পারিবারিক বিরোধ আছে এমন দুই ব্যক্তিকে হত্যাকান্ডের জন্য ফাঁসায় সে। নিজের মোবাইলের সিম কার্ড খুলে ফেলে সে। ২-৩ মাস জেল খেটে ঐ দুই ব্যক্তি জামিন পায়।

তবে ধরা পড়ার দিন ঘনিয়েই আসছিল এই খুনির। গাজীপুরের স্থানীয় এক মসজিদের সিলিং ফ্যান (মতান্তরে মাইক) চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে সে। তখন স্থানীয় একজন তার মোবাইল ফোন ও সিম রেখে দেয়। এরপর অন্য যুবক কোনোভাবে সেই সিম পেয়ে ব্যবহার করতে শুরু করলে পারভীনের মামলার তদন্তকারী পুলিশের এস.আই. মীর কাশেম ঐ নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলেন ও ধীরে ধীরে জানতে পারেন সিমের আসল মালিক সম্পর্কে।

পুলিশ সোর্সের খবরে ঐ বছরেরই ৭ই অক্টোবর টঙ্গীর বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফরিদগঞ্জ থানায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে ফরিদগঞ্জের ৬টি, হাইমচরের ৪টি ও চাঁদপুরের ১টি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেয় যা ৩টি থানার ১০টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশের সাথে হুবহু মিলে যায়।

তার খুনের পদ্ধতি প্রায় একই রকম ছিলো- শ্বাসরোধ করে পানিতে লাশ ফেলে দেয়া। প্রায় প্রতিটি শিকারের শরীরে কামড়ের দাগ এবং ছুরি দিয়ে বক্ষদেশ ও গোপনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার শিকার ছিল ১৬-৩৫ বছর বয়স্ক নারী। একটি মামলায় তাকে ফাঁসি ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের রায় দেয়া

লাদেশি সিরিয়াল কিলার। এ সকল খুনের পেছনে মানসিক অসুস্থতা এবং দীনতাই দায়ী। বাংলাদেশে খোঁজ পাওয়া সিরিয়াল কিলারদের কারো ফাঁসি হয়েছে, কারো নামে মামলা চলছে আবার অনেকেই আইনি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে।