রক্ত হিম করা চিৎকারে চমকে উঠলো না কেউ! নিঃশব্দে, একেবারে নীরবে সারা গেছে কাজটা। নির্জীব দেহখানার খোলা চোখে এখনো বিস্ময়-আতঙ্ক মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে হালকা হতে শুরু করলো রক্তের ধারা, সেই সাথে খেই হারালো ঘটনার একমাত্র সাক্ষী- শেষরাতের ম্লান আলো ছড়ানো চাঁদ। প্রশান্তির সাথে লম্বা পা ফেলে এগিয়ে চললো ছায়ামূর্তি। খুব শীঘ্রই খুঁজে নিতে হবে পরবর্তী শিকারকে…।

নাটক, সিনেমা কিংবা গল্পে এরকম দৃশ্যের হরহামেশাই দেখা পাই আমরা। এই সকল ঘটনা নানা গল্পে, নানা সিরিজে রকমারিভাবে ফুটে উঠেছে এবং এগুলো একটি বিষয়কে ঘিরেই আবর্তিত। আর তা হলো সিরিয়াল কিলিং বা ক্রমহত্যা। বিশ্বের নানা প্রান্তে আজ অবধি প্রচুর সিরিয়াল কিলারের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের বর্বরোচিত আচরণে কেউ বা চমকে ওঠে, কারো বা গায়ে কাঁটা দেয়। তেমনি বাংলাদেশেও সন্ধান পাওয়া গেছে কয়েকজন সিরিয়াল কিলারের- যাদের কেউবা প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে, আবার কেউ প্রতিপত্তির লোভ ও অন্যান্য কারণে বেছে নিয়েছেন এই ঘৃণ্য খুনের নেশাকে। তাদের কয়েকজনকে নিয়েই সাজানো আজকের এই ভিডিও টি।

এরশাদ শিকদার

কুখ্যাত ও আলোচিত এই ক্রমিক খুনির জন্ম ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার মাদারঘোনা গ্রামে। তার পিতার নাম বন্দে আলী। নৃশংস এই সিরিয়াল কিলারের কুলি থেকে ধনাঢ্য হবার কাহিনীর অধিকাংশ অক্ষরই রক্তে লেখা। খুন ছাড়াও অন্যান্য অত্যাচার, চুরি-ডাকাতি ও নানান অপরাধের জন্য কুখ্যাত এই খুনি ১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে জন্মস্থান ছেড়ে খুলনায় আসে এবং রেলস্টেশনে কুলির সহকারী হিসেবে কাজ নেয়।

কালক্রমে সে রেললাইনের পাত চুরি করে অবৈধভাবে বিক্রি করার চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়ে। একসময় সে নিজেই তাদের নিয়ে নতুন দল গঠন করে ও রাঙ্গা চোরা নামে পরিচিতি পায়। ১৯৭৬-৭৭ সালে রামদা বাহিনী গঠন করে ডাকাতি, রাহাজানি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের পর ঐ বাহিনী নিয়েই ’৮২ সালে ৪ ও ৫ নং ঘাট এলাকা দখল করে তার একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে।

রাজনৈতিক ব্যাপারে সে ছিল যথেষ্ট সুবিধাবাদী, যখন যে দল সরকার হিসেবে নির্বাচিত হতো, সেখানে যোগ দিতো এই খুনি। ভয় দেখিয়ে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়ে সে রাজনৈতিক সুবিধা ও সমর্থন আদায় করতো। খুলনার বরফকল মালিক রফিককে ভয়পূর্বক বিতাড়িত করে মানুষকে সেখান থেকে বরফ কিনতে বাধ্য করে এবং বরফকলকে তার নির্যাতনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করে সে। ঐ বরফকলে টর্চার সেল গড়ে তোলে এরশাদ শিকদার। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে যে-ই তার প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হতো তাকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে দ্বিধা করতো না সে। যাকে ভালো লাগতো তাকেই তুলে এনে নির্যাতন করতো সে। এমনকি ভাড়াটে খুনি হিসেবেও তার খুন করার নজির আছে।

তার এক হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষ সাক্ষীর মতে, ১৯৯৯ সালের ১৫ই মে খালিদ হোসেন নামক যুবলীগ নেতাকে নির্মমভাবে পেটানোর পর তার বুকের ওপর নিজে লাফিয়ে পড়ে এই খুনি এবং ফলশ্রুতিতে পাঁজরের সব হাড় ভেঙ্গে মৃত্যু হয় তার। এ হত্যাকাণ্ডে তার সহযোগী ছিল জামাই ফারুক ও লিয়াকত লস্কর। ১৯৯৯ সালের ১১ই আগস্ট গ্রেফতার হয় এই খুনি। গ্রেফতার কালে তার নামে ৪৩টি মামলা হয়েছিল।

৬০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগযুক্ত এই খুনি ১৮টি কেসে বেকসুর খালাস পেলেও ৭টি মামলায় তার ফাঁসির সাজা হয় এবং চারটিতে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় হয়। তার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে ২৪টি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেয় তার সহযোগী নূরে আলম। শিকদারের কাছে ৭০টি আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কথা নূরে আলম বললেও এরশাদের বাড়ি স্বর্ণকমল থেকে মাত্র একটির সন্ধান পাওয়া যায়। ঘৃণ্য অপরাধী ও নৃশংস এই খুনির করা প্রাণভিক্ষার আবেদন মহামান্য রাষ্ট্রপতি নাকচ করে দেন। অতঃপর ২০০৪ সালের ১০ই মে খুলনা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির মাধ্যমে অবসান ঘটে এই ত্রাসরূপী পিশাচের।

মাহফুজ

মাত্র ২০ বছর বয়সী এই যুবক মাত্র চার ঘণ্টায় খুন করে তার ৫ জন নিকটাত্মীয়কে! খুনের অস্ত্র হিসেবে শিলপাটার শিল বেছে নিয়েছিল এই ঘাতক। শিলের আঘাতে সবাইকে হত্যা করে অচেতন না করেই। তাৎক্ষণিকভাবে এই খুনের সিদ্ধান্ত সে নিয়েছিল। পুলিশের ভাষায় অপেশাদার খুনি হলেও তার খুনের পেছনে কাজ করা মনোবল এতটাই দৃঢ় ছিল যে, সে প্রথম খুনটি করার পরেও দরজা খুলে না পালিয়ে একে একে দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ খুনগুলো সফলতার সাথে করে।

এরপর সে অপেক্ষা করতে থাকে। বাসায় ফিরে এলে অনুজ মামাতো ভাই শান্তকেও সে নিস্তার দেয় না। এরপর সে শিল ও কাপড় থেকে যথাসম্ভব রক্ত মুছে পোশাক পাল্টে ফেলে। সে যে হোসিয়ারিতে কাজ করত সেখানে গিয়ে গোসল করে ঘুমিয়ে পড়ে। খুনির ভাষ্যমতে তার ছোট মামী লামিয়ার সাথে তার প্রণয়ের সম্পর্ক ছিলো (যদিও নিহতদের আত্মীয়ের এ ব্যাপারে দ্বিমত আছে)। সে ১৫ই জানুয়ারী রাতে ওই ঘটনাস্থলে খাটের নিচে লুকিয়ে পড়ে, কিন্তু ধরা পড়ে যায়। এরপর তীব্র আক্রোশে সে হত্যাকান্ডগুলো ঘটায়। পাঁচজনের হত্যাকান্ড সে একাই ঘটায়- তার এই বক্তব্যে পুলিশও হতবাক হয়ে যায় .।

এমনিভাবে নানান হত্যাকান্ড ও তার আগে নির্যাতনে পিছ পা হয়নি এ সকল বাংলাদেশি সিরিয়াল কিলার। এ সকল খুনের পেছনে মানসিক অসুস্থতা এবং দীনতাই দায়ী। বাংলাদেশে খোঁজ পাওয়া সিরিয়াল কিলারদের কারো ফাঁসি হয়েছে, কারো নামে মামলা চলছে আবার অনেকেই আইনি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে।

ভিডিওঃ