বাংলাদেশের সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থাপিত ভবন বিশেষ। এই সংসদ ভবনটি তৈরির প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল তদানীন্তন পাকিস্তানী সরকার। পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক সরকার ঢাকা-কে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী হিসাবে ঘোষণা দেয়। এই সূত্রে ঢাকার শেরে-বাংলা নগরে একটি সংসদ ভবন তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে।

  ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে এই ভবন তৈরির উদ্দেশ্যে ঢাকার শেরে-বাংলা নগরে ২০৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এই ভবনটির নকশা তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন তৎকালীন খ্যাতনামা মার্কিন স্থপতি লুইস কান (Louis Kahn, প্রকৃত নাম  Itze-Leib (Leiser-Itze) Schmuilowsky (Schmalowski)।  ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে কান ভবনটির নকশা সরকারের কাছে জমা দেন। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে এই নকশা অনুসারে ভবনটিত তৈরির জন্য ১ কোটি ৫০ লক্ষ মার্কিন ডলার অনুমোদন করা হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এর নির্মাণ কাজ বন্ধ ছিল। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে মূল পরিকল্পনা অনুসারে কাজটি পুনরায় শুরু হয়। এই বৎসরে কান মৃত্যু বরণ করেন।  উল্লেখ্য,  ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে এটি ‘আর্কিটেকচার ফর দ্যা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিং’ হিসেবে স্থাপত্যবিদ্যার সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক পুরস্কার ‘দ্যা আগা খান’ অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

  কানের মৃত্যুর পর  প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলাম (লুইস কান-এর শিষ্য) অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করেন। তবে এক্ষেত্রে মূল পরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছিল। কমপ্লেক্সের ঠিক মাঝখানে রাখা হয় মূল ভবনটি। আর এই ভবনটিকে কেন্দ্র করে রাখা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট, মসজিদ এবং রাষ্ট্রপতির বাসভবন। এই পরিবর্তিত পরিকল্পনায় এই ভবনগুলোকে নির্মাণ-পরিকল্পনা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে মূল কমপ্লেক্সটি সৌন্দর্যের বিচারে নিস্প্রভ হয়ে যায়।

  ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। ২৮ জানুয়ারিতে এর উদ্বোধন করেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। শেষ পর্যন্ত কাজটি সম্পন্ন করতে খরচ হয়েছিল ৩ কোটি ২০ লক্ষ মার্কিন ডলার। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে এই ভবনে প্রথম সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

  মূল ভবনটি তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। এই ভাগগুলো হলো- প্রধান প্লাজা, দক্ষিণ প্লাজা ও উত্তর প্লাজা। এই ভাগগুলোতে রয়েছে নয়টি স্বতন্ত্র বিভাগ। এর ভিতরে ৮টির উচ্চতা ৩৩.৫৩ মিটার। মূল ভবনটির উচ্চতা ৪৭.২৪ মিটার। এর প্রধান প্লাজার আয়তন ৭৯,৪৫৯,২০ বর্গমিটার, দক্ষিণ প্লাজার আয়তন ২০,৭১৭.৩৮ বর্গমিটার, আর উত্তর প্লাজার আয়তন ৬,০৩৮.৭০ বর্গমিটার। এর দক্ষিণ প্লাজায় রয়েছে মূল ভবনে প্রবেশ পথ। এই পথটি ধীরে ধীরে সিঁড়ির আকারে ৬.২৫ মিটার উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছেছে। এর ভিত্তিকক্ষে রয়েছে গাড়ির রাখার সুবিধাদি এবং ভবনের কার্যক্রমের উপযোগী বিভিন্ন ব্যবস্থাদি। এর কেন্দ্রে রয়েছে সংসদ অধিবেশন চলার বিশাল কক্ষ। সাততলা উঁচু গোলাকার মূল কক্ষটিতে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশের সুযোগ রাখা হয়েছে। ভবনের চার কোণায় রয়েছে চারটি কার্যালয় অংশ। ভবনের সর্বোচ্চ তলাটিকে বলা হয় লেভেল ১০। এখানে ভবন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি রয়েছে।

  ভবনটিতে রয়েছে ৩৪০টি শৌচাগার, ১৬৩৫টি দরজা, ৩৩৫টি জানালা, ৩০০টি বিভাজক দেওয়াল, ৩,৩৩৯,৫৭ বর্গমিটার কাঁচের শার্টার, ৫,৪৩৪,৮৩ বর্গমিটার কাঠের শার্টার, ৩,৭৩৮ ঘনমিটার কাঠের প্যানেল।

  এই ভবনের চারপাশে রয়েছে  বিশাল সবুজ ঘাসের অঙ্গন, হ্রদ ও সাংসদদের জন্য নির্মিত আবাসিক ভবন। কমপ্লেক্সটির চারপাশ দিয়ে গেছে প্রধান চারটি সড়ক (উত্তর দিকে লেক রোড, পূর্ব দিকে রোকেয়া সরণি, দক্ষিণ দিকে মানিক মিয়া এভিনিউ; এবং পশ্চিম দিকে মিরপুর রোড)। ভবনটি ঘিরে একটি কৃত্রিম হ্রদ রয়েছে, যে কারণে মনে হয়, পুরো ভবনটি পানির উপর ভেসে রয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রতীক হিসাবে লুই কান এই হ্রদের সংযোজন করেছিলেন।

  তাঁর নকশায় প্রাকৃতিক আলোর পাওয়ার জন্য ভবনে বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছিলেন। তিনি এই ভবনে বৃত্ত, অর্ধবৃত্ত, বর্গ, ত্রিভুজের কাঠামোগুলো দিয়ে একটি নতুন নতুন ধরনের সৌন্দর্যকে প্রকাশ করেছেন। এই ভবনে কোনো সরল খুঁটি নেই। মূলত ভবনের ভর সঞ্চলানের জন্য খুঁটিগুলিকে জ্যামিতিক নকশায় এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে, দেখে মনে হয় পুরু ভবনের কক্ষগুলো খুঁটি ছাড়াই দাঁড়িয়ে আছে।

 এর বিশাল পরিকাঠামোর ভিতরেই এর মূল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে। কংক্রিটের তৈরি বিশাল বহির্দেয়ালের মাঝে মাঝে ভবনের প্রবশ দ্বারগুলো স্থাপন করা হয়েছে জ্যামিতিক শৈলী অনুসরণে।

  মূল সংসদ অধিবেশন কক্ষে রয়েছে এক সাথে ৩৫৪ জন সদস্যের বসার ব্যবস্থা। এছাড়া আছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের বসার উপযোগী দুইটি পোডিয়াম এবং দুইটি গ্যালারি। পরাবৃত্তাকার ছাদসম্পন্ন অধিবেশন কক্ষটির উচ্চতা ১১৭ ফুট। ছাদটিতে ব্যবহার করা হয়েছে স্বচ্ছ উপকরণাদি। এবং আলো প্রবেশের উপযোগী জ্যামিতিক কৌশল। সূর্যের আলো চারদিকের ঘেরা দেয়াল ও অষ্টভূজাকৃতির ড্রামে (Drum) প্রতিফলিত হয়ে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করে। এছাড়া কৃত্রিম আলোকে এমনভাবে বিভাজিত করে ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে একই সাথে সূর্যের আলোর প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি না করে। এই কক্ষের ঝাড়বাতিগুলো পরাবৃত্তাকার ছাদ থেকে নিচে নেমে এসে থেমেছে একটি নান্দনিক উচ্চতায়।

  এর প্রথম তলায় রয়েছে একটি গ্রন্থাগার। দ্বিতীয় তলার একটি ব্লকে প্রধান কমিটির কক্ষগুলো রয়েছে। সকল ধরনের সংসদীয় কার্যক্রম, মন্ত্রী, চেয়ারপারসন এবং স্ট্যান্ডিং কমিটির অফিস রয়েছে এই ভবনে। একই ভবনে সংসদীয় সচিবের জন্যও কিছু অফিস বরাদ্দ রয়েছে। তৃতীয় তলায় রয়েছে সংসদ সদস্যদের জন্য লাউঞ্জ; এবং উপর তলায় রয়েছে মিলনায়তন।