রুবানা হক (২৩) প্রকৃত নাম নয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অনার্স পড়ছেন। শাহিন নামের এক জনের সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। পরবর্তীতে বন্ধুত্ব ও সম্পর্কেও গভীরতা বেড়ে যায়। তিনি আরো বলেন, আমি শাহিনের প্রেম ভালবাসাকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছিলাম। ভালবাসার অভিনয়ে আমাকে এতটা মুগ্ধ করে যে তার প্রতারণা আমি একটুও বুঝতে পারিনি। এক সময় শাহিন আমাকে বিয়ে করার অঙ্গিকার করে এবং আমাদেরও মাঝে বিয়েপূর্ব শারীরিক সম্পর্ক শুরু হয়। সে সব দৃশ্য গোপন ক্যামেরায় ধারণ করেছে সিডি আকারে বাজারে ছাড়লে ব্যবসায়ীরা তা পর্ণো সিডি হিসেবে লুফে নেয়। সরলতার সুযোগ নিয়ে আমার পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষাজীবন ও উজ্জল ভবিষ্যত ধ্বংস করে দিয়েছে। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর প্রতারক শাহিন বিদেশে পাড়ি দেয়। আমি এখন বলতে গেলে বন্দী জীবন যাপন করছি। বন্ধুত্ব প্রেম ভালবাসা অভিনয়ে এমন প্রতারণা কেউ করতে পারে তা আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

রুবানার মতো এমন অসংখ্য নারী প্রেমিকের দ্বারা প্রতারণার শিকার হয়ে প্রেম ভালবাসা বন্ধুত্বের উপর আস্থা হারিয়ে একাকীত্ব জীবন বেছে নেয়েছেন। তেমনি প্রতারণার শিকার মীনা আহমেদ (৪২)। তিনি বললেন, “কলেজ জীবনে আমার বন্ধুত্ব হয় শিহাবের সাথে। কিছুদিন পর তার সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিন্তু এরই মধ্যে আমি আমেরিকা যাওয়ার সুযোগ পাই। তখন শিহাবকে বিয়ের কথা বললে দুই বছর পর বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিদেশে থাকাকালীন সময়ে শিহাবকে প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকার মতো অনেক উপহার পাঠিয়েছি। দুই বছর পর তাকে বিয়ে করার জন্য দেশে এসে শুনি শিহাব গোপনে বিয়ে করেছে।

তিনি আরো বললেন শিহাবকে বিশ্বাস করার উপহার হিসেবে আমাকে প্রতারিত হতে হলো। এখন শুধু নিঃশ্বাস নিয়ে বেচেঁ আছি এবং বেছে নিয়েছি একোকীত্বের জীবন। এই দুঃসহ প্রতারণায় আমি ব্যাথিত, অভিব্যক্তিহীন ও অসহায়। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রাথনা করি এরকম বিশ্বাস ভঙ্গের যাতনা নিয়ে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা যেন আর কোন মেয়ের না হয়।

পুরুষদের প্রতারণা সম্পর্কে নারীনেত্রী মালেকা বেগম বললেন, “বন্ধুত্ব মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আর প্রতারণা নিয়ে বলতে গেলে বলতে হবে মেয়েরা নিজেদেও ভূলের কারনেই প্রতারিত হয়। যে বয়সে মেয়েরা প্রতারিত হয় বয়সের দিকে থেকে তারা ছোট খুব থাকেনা। জেনে শুনে ভূলে জড়াবে প্রতারিত হবেনা এটা হয়? শুধু ছেলেরা প্রতারণা করে এটা ঠিক নয় বর্তমানে মেয়েরা ও প্রতারণা করছে এমন দৃষ্টান্ত সমাজে প্রচুর। এ বিষয় নিয়ে আন্দোলন করার কিছু নেই। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলন সফল হতে পারলে মেয়েদের সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটবে।

বর্তমান অস্থিতিশীল সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়েদেরকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে অভিভাবক। প্রত্যেক মা-বাবাই মেয়েদেরকে যোগ্য পাত্রে পাত্রস্থ করার আশা করে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। ভালোবাসা বা পারিবারিক বিয়ে উভয় ক্ষেত্রেই প্রতারণার শিকার হচ্ছে মেয়েরা। প্রতারিত হওয়া নাহিদা ফেরদৌস এর মা হামিদা বানু জানান, আমার মেয়ের প্রেম ছিল তার সময়বয়সী এক ছেলের সাথে একই বিষয়ে পড়তো দু’জনে। নাহিদা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাষ্টার্স করে ব্যাংকে কাজ করছিল আর ছেলেটি সরকারি কলেজে, নাহিদাকে আমরা বিয়ের জন্য চাপ দিলে ছেলেটি পরিবারকে তার পছন্দের মেয়ের কথা জানালে ছেলের মা-বাবা সময়সী মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে রাজী না হওয়ায় ছেলেটি বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। এই আঘাত সহ্য করতে না পেরে নাহিদা বিদেশে চলে যায়। এবং সারাজীবন একা থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।

এক কথায় বিশ্বাস ভাঙ্গার নামই প্রতারণা। আত্মকেন্দ্রিক, নির্দয়, লোভী, অত্যাচারি, বিকৃত মানসিকতার বন্ধু বা প্রেমিক সর্বদাই নিজস্বার্থ চরিতার্থ করার অপেক্ষায় থাকে বিকৃত মানসিকতার বন্ধুরা।

এখানে উল্লেখ করা যায়, সুমন, পিন্টু, অভি নামের বন্ধুরূপী প্রতারকরা ভালবাসার অভিনয়ে প্রতারণা করে একে একে কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কেও দৃশ্য গোপন ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করে তার সিডি বজারে ছেড়েছে ব্যবসায়িক মনোবৃত্তিতে। এ সব ভিডিও সিডির কিছু কিছু স্থিরচিত্র তারা একটি ফ্রি ওয়েবসাইটেও প্রদর্শণ করে। এই গোপন সিডিগুলো দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছে যায়। সে সময় সুমনের সিডি’ নামে পরিচিত এসব সিডি প্রতি ঘন্টায় ৩০০ টাকা ভাড়ায় চলেছে। এ ধরনের প্রতারণা করে সুমন পিন্টু, অভিরা আমেরিকা প্রবাসী হয়েছে এবং আজো তাদের বিচার হয়নি। (সূত্র ৭-১২-০১, সাপ্তাহিক-২০০০)

প্রতারণা সম্পর্কে হাইকোর্ট ডিভিশনের অ্যাডভোকেট রেবেকা সুলতানা বললেন, ছেলে মেয়র বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে মেয়েরা প্রতারিত হলে এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোন আইন নেই। কিন্তু বিয়েপূর্ব যৌনসঙ্গম করলে বাংলাদেশ দন্ডবিধি -৪৯৩, পেনাল কোড-৪৯৩) ধারায়, প্রতারিত হওয়া মেয়েরা মামলা করতে পারে। প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণিত হলে ১০ বছরের কারাদন্ড এবং অর্থদন্ড সহ দুটোই হতে পারে।
তিনি আরো বললেন, প্রতারণার কারণে এ পর্যন্ত অনেক মামলা হয়েছে যা বিচারাধীন। বর্তমানে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে প্রতারণার মাত্রা অনেক বেড়েছে। কারণ আমরা সামাজিক রীতিনীতি তেমন মেনে চলিনা, এবং খুব আধুনিক মনষ্ক হয়ে পড়েছি। সুশীল সমাজ ও পরিবারে স্বচেতন দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে যার যার মত ভূমিকা পালন করলে সমাজে মেয়েদের প্রতারিত হওয়ার মাত্রা কমে আসবে। কিন্তু ছেলেদের এ ক্ষেত্রে মামলা করার কোন সুযোগ নেই। প্রতারণা শুধু ছেলেরা করছে কে বললো? মেয়েরাও কম করছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মরিয়ম চৌধুরী বলেন, বন্ধু হবে আচার আচরণে সৎ, জ্ঞানার্জনে আগ্রহী, সুখ দু:খের সাথী এবং বন্ধুর চিন্তা-চেতনা ও ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বর্তমান সময়ের বন্ধুত্ব আত্মকন্দ্রেীকতা, স্বার্থপরতা, প্রেমহীন মানসিকতায় ভরপুর। মায়ামমতা, প্রেম-ভালবাসা, সহানুভূতি, বিশ্বস্ততা,নীতিবোধ এসব গুণাবলী আজ প্রতারণার কাছে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের ডাইরেক্টর বলেন, “বন্ধুত্ব হলো সামাজিক সম্পর্ক। সমাজে যুগ যুগ ধরে প্রতারণা চলছে, ছেলে-মেয়ে উভয়েই প্রাতরণা করে এবং ভঙ্গ করে বন্ধুত্বের প্রতিজ্ঞা। এটি সত্য যে আমাদের সমাজে মেয়েরাই বেশি প্রতারণার শিকার হয়। আর প্রতারণা শুরু হয় ছেলেদের উদ্দেশ্য প্রণোদিত বিয়েপূর্ব যৌন সম্পর্ক থেকে।

তনি আরো বলেছেন, “প্রতারনার ক্ষেতে পুরুষতান্ত্রিক কর্তত্ব কাজ করে। ছেলেরা যে বন্ধুত্ব ও বালবাসার প্রতারণা করে তা প্রথম থেকেই মেয়েদের বুঝতে পারার কথা তাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের কারণে। এক্ষেত্রে মেয়েদের দূরদর্শিতা বেশী থাকার পরও সীমাহীন ভালবাসা ও দূর্বলতার কারণে মেয়েরা প্রতারণার শিকার হন। প্রতারিত হওয়া মেয়েটি সামাজিক প্রভাবের চাপে অনেক সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এমনকি অনেকে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা পথও বেছে নেন। আবার অনেকে পুরো পুরুষ জাতিকে সে ঘৃণার চোখে দেখে ও তাদের প্রতি বিশ্বাস হারান।”

সমাজ বিজ্ঞানীর মতামত:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্দ সামাদ বলেন, “সব ধরণের সম্পর্কই নির্ভর করে বিশ্বাসের উপর। বন্ধুত্বের মত সম্পর্কে বিশ্বাস অপরিহার্য। ছেলেমেয়ে উভয়েরই বন্ধুত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। অতীতে ছেলে মেয়ের বন্ধুত্ব অত্যন্ত সংগোপনে হত। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির কারণে ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পকের গোপনীয়তা তেমন নেই। বন্ধুত্বে শরীরিক কোন সম্পর্ক থাকবেনা। শুধুই মানসিক সম্পর্কে যারা বিশ্বাস করে তাদের ক্ষেত্রে প্রতারিত হওয়া সম্ভাবনা নেই। আর যারা শারীরিক সম্পর্কে বিশ্বাস করে তাদের ক্ষেত্রেই প্রতারণার ঘটনা ঘটে। ছেলে-মেয়ে দু’জনের জন্যই এ কথা প্রযোজ্য। সামাজিক মূল্যবোধ ও পুরুষ শাসিত সমাজ হওয়ার কারণে বিশেষভাবে মেয়েরাই খুব বেশি প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ছেলেরাও হয় তবে সংখ্যায় কম।

তিনি জানান, বন্ধুত্বে প্রতারণা খুব ভীতিকর ও অনাকাংখিত। এ ধরণের ঘটনা সমাজে ঘটতে থাকলে সামাজিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বস্ততার অবনতি ঘটবে যা কোন সুস্থ সমাজের জন্য কাম্য নয়।(এ লেখার প্রতিটি নামই কাল্পনিক)