ওই দৃশ্য কল্পনা করতে গিয়ে ক’জন পুরুষের যৌন উত্তেজেনা জাগেনি, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। নির্যাতন করার জন্যও কিন্তু হাত নিশপিশ করে ওদের।

মনে আছে পুর্ণিমার কথা? সেই পূর্ণিমা, সেই অষ্টম শ্রেণিতে পড়া ছাত্রী। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার মেয়ে। বাবা সেলুন চালাতো। সেই পূর্ণিমা, যাকে ২০০১ সালের ৮ অক্টোবরে ধর্ষণ করেছিল এক পাল পুরুষ।

২০০১ সাল তখন। সেই পূর্ণিমা। পূর্ণিমার তখন বয়স ছিল ১৩। ওকে এক নির্জন ক্ষেতের মধ্যে নিয়ে ধর্ষণ করেছিল পুরুষগুলো। তখন বিএনপি জামাতি ঐক্য জোট ক্ষমতায়। পূর্ণিমার বাবা মামলা করেছিলেন ১৭ জন ধর্ষকের বিরুদ্ধে। ৬ জন ছাড়া পেয়েছিল। ১০ বছর মামলা চলার পর ১১ জন ধর্ষকের হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ১১ জনের মধ্যে অবশ্য ৬ জনই পলাতক।

পূর্ণিমার জীবনে নেমে আসে ঘোর অমাবস্যা। সেই অমাবস্যা দূর করতে পূর্ণিমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন দেশের ক’জন সচেতন মানুষ। ওয়াহিদুল হক, শাহরিয়ার কবির আর ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির কিছু সদস্য।

প্রাবন্ধিক মুনতাসীর মামুন লিখেছিলেন, ‘পূর্ণিমা ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের মতো একটি প্রতীক। এ মেয়েটি সুশীলদের, আমাদের চড় মেরে বুঝিয়ে দিল আমরা মানুষ নই। কারণ আমরা নাবালিকাকে ধর্ষণ করেছি, আমরা ধর্ষিতাকে রক্ষা করিনি, ধর্ষকদের বিচার থেকে অব্যাহতি দিতে চেয়েছি এবং এর প্রবল প্রতিবাদ করিনি। পরিবারটিকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসিনি।’

পূর্ণিমাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়, স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। পূর্ণিমা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়েছে। অমাবস্যা কাটিয়ে পূর্ণিমা আলোকিত করতে চাইছে নিজের জীবনকে। কিন্তু তার জন্য সহজ নয় অনেক কিছু। সহজ নয় কারণ পূর্ণিমাকে ধর্ষিতা হতে হয়েছিল।

অন্য কোনও নির্যাতনের শিকার হলে মানুষ হয়তো পাশে দাঁড়ায়, কিন্তু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে দাঁড়ায় না। ওই ক’জন মানুষ পাশে যদি না দাঁড়াতেন, তাহলে মেয়েটি সত্যি সত্যি মারা পড়তো। আর কতবার তাকে ধর্ষিতা হতে হতো, কে জানে।

কিছুদিন আগে বিবিসিতে পূর্ণিমার নিজের মুখে কিছু কথা শুনে খুব মন খারাপ হয়ে গেল। পূর্ণিমা বলেছে, ‘হঠাৎ করে আমি ফেসবুকে গেছি, দেখি আমার ছবি দিয়ে একটি আইডি খোলা, সেখান থেকে পোষ্ট করা হচ্ছে নোংরা ছবি, নোংরা কথা, আমার মোবাইল নাম্বার।

কলিগদের সঙ্গে ওই আইডিটা যুক্ত হয়ে গেছে। ওরা আপন মনে করে ওই আইডির রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করেছে, করেছে কারণ আমি তাদের কলিগ। পরে অবশ্য নোংরা ছবি দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘কী রে? তুই এরকমভাবে নোংরা ছবি পোস্ট করছিস, তুই কি ওগুলো করে খাস?’ আমাকে এক ফ্রেন্ড বলছে, ‘কত টাকা চাই তোর’?’

পূর্ণিমা আরও বলেছে, ‘স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি এই তিনটা জীবনে এসব ফেইস করতে হয়েছে আমাকে, এগুলোর জন্য আমি রাস্তায় হাঁটতে পারি না, অনেকে আমাকে বলেছে, ‘এই সেই মেয়েটা’।

অনেকে আমাকে রাস্তায় পিছন থেকে রাস্তায় চুলের মুঠি ধরেও মেরেছে। কেন আমার সঙ্গেই কেন এটা হচ্ছে? এটা কেন হচ্ছে? আমাকে বলছে আমার কলিগরা যে, ‘পূর্ণিমা তোমার কি লজ্জা বলতে কিছু নাই?’ এটা আমার লজ্জা না। এটা বাংলাদেশের সমাজের লজ্জা।

পূর্ণিমার ধর্ষণের জন্য পূর্ণিমাকে দায়ী করার লোকের অভাব নেই বাংলাদেশে। পূর্ণিমা ধর্ষিতা হয়েছে বলে পুর্ণিমাকে ঘৃণা করার লোকের বাংলাদেশে অভাব নেই। ধর্ষিতা হয়েছে বলে বাংলাদেশে তাকে পুনরায় ধর্ষণ করার ইচ্ছে হওয়ার অভাব নেই পুরুষের।

পূর্ণিমা মুখ লুকিয়ে কাঁদেনি, কোনও আড়াল বা অন্ধকার বেছে নেয়নি। দেশ থেকে পালিয়ে যায়নি, ভারতবর্ষে শরণার্থি হয়নি। দেশেই থেকেছে, তবে মাথা নুইয়ে থাকতে চায়নি। মেয়েটিকে তারপরও তার দেশ, প্রিয় দেশ বাসযোগ্য কোনও পরিবেশ দেয়নি।

এই যে মানুষ এক একেকটা নৃশংস ধর্ষণের খবর শোনার পর বলে, ‘ধর্ষকদের ফাঁসি দাও, ওদের পুরুষাঙ্গ কেটে দাও’। ধর্ষকদের প্রতি ঘৃণা আর ক্ষোভ উথলে ওঠে, অথচ আশ্চর্য্য, ধর্ষণের শিকারকে সাহায্য করার জন্য বেশি কেউ এগিয়ে আসে না।

অথচ আশ্চর্য্য, ধর্ষিতা মেয়েটিকে পুনরায় ধর্ষণ করার জন্য পুরুষেরা তৈরি হতে থাকে। মেয়েটি নির্যাতন আর ধর্ষণের শিকার হওয়ার মানে মনে হয় সে নির্যাতন আর ধর্ষণের জন্য সার্টিফিকেট অর্জন করেছে।

মানে, তাকে যে কেউ এখন থেকে নির্যাতন আর ধর্ষণ করার অধিকার রাখে। মেয়েটি যেহেতু ধর্ষিতা হয়েছে, নিজের ‘সতীত্ব হারিয়েছে’, যা হারিয়ে গেছে, তা যেহেতু রক্ষা করার এখন আর প্রশ্ন ওঠে না, তাই অনায়াসে মেয়েটিকে আবার ধর্ষণ করা যেতেই পারে।

সতী নারী সাজার আর কোনও দায় পূর্ণিমার নেই বলে, সমাজের পুরুষেরাই একরকম সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় পূর্ণিমার কী করা উচিত বা উচিত নয়। মুখে যাই বলুক, সমাজের পুরুষেরা আসলে ছলে কৌশলে ধর্ষকদের ক্ষমা করে, ধর্ষিতাদের ক্ষমা করে না।

কে একজন বলেছিল, সব পুরুষই এক একেকটা পটেনশিয়াল রেপিস্ট। তা ঠিক, যে কেউ রেপিস্ট হতে পারে। যারা হয় না, তারা অনেকেই সুযোগের অভাবে হয় না। মনে মনে ধর্ষণ, আমার ধারণা, সব পুরুষই করে। পূর্ণিমাকে ধর্ষণ করার দৃশ্যটি কল্পনা করেনি এমন পুরুষের সংখ্যা নিতান্তই কম।

ওই দৃশ্য কল্পনা করতে গিয়ে ক’জন পুরুষের যৌন উত্তেজেনা জাগেনি, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। নির্যাতন করার জন্যও কিন্তু হাত নিশপিশ করে ওদের। ধর্ষকগুলো পূর্ণিমাকে কামড়াচ্ছিল, খাবলাচ্ছিল, খামচাচ্ছিল— এই খবর শোনার পর পুরুষদেরও ওভাবে পূর্ণিমাকে কামড়াতে, খাবলাতে, খামচাতে ইচ্ছে করছিল নিশ্চই।

সমাজ যখন কাউকে বলে দেয় তোমার যেহেতু একটি পুরুষাঙ্গ আছে, তুমি সমাজের কর্তা। তখন পুরুষাঙ্গটিকে বড় ভালোবেসে ফেলে পুরুষেরা। এটি যে কত প্রচণ্ড শক্তিশালি তা প্রমাণ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। মেয়েদের ওপর যা যা অন্যায়, অত্যাচার, যৌন হেনস্থা, নির্মম নির্যাতন করে পুরুষেরা, সব করে ঐ পুরুষাঙ্গকে অতিরিক্ত ভালবাসার কারণে, ওটির ওপর অতিরিক্ত আস্থার কারণে।

সমাজে যেদিন থেকে পুরুষাঙ্গের পুজো করা বন্ধ হবে, সেদিন থেকেই পিতৃতন্ত্রের মতো একটি বৈষম্যমূলক সমাজব্যাবস্থার অবসান হবে, পুরুষতন্ত্রের মতো একটি গুন্ডারাজের পতন ঘটবে, তখনি বন্ধ হবে ধর্ষণ, আর যাবতীয় পুরুষিক বর্বরতা।

পুরুষাঙ্গের অত্যাচার থেকে বাঁচতে বাংলাদেশের মেয়েদের মধ্যে এখন হিজাব পরার হিড়িক পড়েছে। হিজাব পরলে পুরুষেরা তার চুলের সৌন্দর্য দেখতে পাবে না,শরীর ঢেকে রাখলে পুরুষেরা তার শরীরের সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টি দেবে না, সে বেঁচে যাবে পুরুষাঙ্গের কবল থেকে।

হিজাব জিনিসটাই প্রমাণ করে পুরুষ কতটা ভয়ঙ্কর। কতটা তারা মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আর কোনও প্রজাতির নারীদের কিন্তু ওই প্রজাতির পুরুষদের ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় না। মানুষ-প্রজাতির পুরুষেরা যত হিংস্র , তত আর কোনও প্রজাতির পুরুষেরা নয়।

পুরুষেরা তাদের পুরুষাঙ্গ পুজো বন্ধ করবে না, আপাতত নারীরাই বন্ধ করুক। অন্তত প্রজাতির অর্ধেক পুরুষতান্ত্রিক না হোক। অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা হোক, আমরা সবাই নষ্ট হয়ে যাইনি।

লেখক: তসলিমা নাসরিন