আইন অঙ্গনে নোটারি পাবলিক এক অতি পরিচিত নাম‌‌‌। কোনো গুরুত্বপূর্ণ দলিল বা ডকুমেন্টকে সত্যায়িত করতে গেলেই নোটারি পাবলিকের প্রয়োজন পড়ে। আমাদের দেশে সাধারণত নোটারি পাবলিকের কাজ অনুমোদিত আইনজীবীরাই করে থাকেন। নোটারি পাবলিককে সংক্ষেপে নোটারি বলা হয়ে থাকে। নোটারি শব্দের মূল নামপদ ‘note’ এবং ‘ary’ অনুসর্গ নিয়ে গঠিত। শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষার nota+arius থেকে, এর অর্থ শর্টহ্যান্ড লেখক, কেরানি ইত্যাদি।

নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৮১ তে ঋণখত, দাবিনামা এবং চেক সংক্রান্ত বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্টের সেকশন ১৩৮ তে নোটারি পাবলিক হিসেবে নিযুক্তি দেয়ার জন্য সরকারকে ক্ষমতা প্রদান করেছে।

পাকিস্তান সরকার প্রণীত নোটারিয়াল অর্ডিন্যান্স ১৯৬১ এবং নোটারিস অর্ডিনেন্স এবং নোটারিস রুলস , ১৯৬৪ অনুসরণ করেই মূলত নোটারি পাবলিক নিযোগ দেওয়া হয়। সাধারণত কোন ব্যক্তি যিনি কমপক্ষে সাত বছর আইনজীবী হিসেবে কর্মরত আছেন অথবা বিচার বিভাগের সদস্য হিসেবে কমপক্ষে পাঁচ বছর কর্মরত ছিলেন অথবা সরকারের লেজিসলেটিভ ড্রাফটিং এবং সরকারের আইন প্রনয়ণ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি নোটারি হিসেবে নিয়োগ পাবার যোগ্য । এই আইনে তাদের ক্ষমতা, কার্যাবলী, বেতন ভাতাদি ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট করা থাকে। এর আগে নোটারিয়াল অধ্যাদেশ প্রবর্তনের পূর্বে নোটারি পাবলিক নিয়োগ দেওয়া হতো ইংল্যান্ডে মাস্টার অব ফ্যাকাল্টিজ কর্তৃক।

যোগ্যতা পূরণসাপেক্ষে সরকার যেকোন আইনজীবি অথবা আইনজীবি নন এমন ব্যক্তিকেও সারা দেশের জন্য অথবা বাংলাদেশের কোন অংশের জন্য নোটারি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে। বাংলাদেশে নোটারি নিয়োগে পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই এবং যেকোন যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ নির্ধারিত ফরম পূরণ করে আবেদন করতে পারেন। নোটারি হিসেবে নিয়োগ পেতে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ বরাবর এমন আবেদন ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিনিধি, ব্যাংকার, বণিক ও সংশ্লিষ্ট এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অন্তত ১০ জনের প্রতিস্বাক্ষর সম্বলিত হওয়া উচিত।

যে সকল কারণে নোটারি করা হয়ঃ-

  • কোন দলিল প্রতিপাদন, প্রামাণীকরণ, সনদ প্রদান কিংবা সত্যায়ন
  • পেমেন্ট অথবা ডিমান্ড এর ক্ষেত্রে অধিকতর নিরাপত্তার জন্য কোন প্রমিজরি নোট , হুন্ডি অথবা বিল অব এক্সচেঞ্জ উপস্থাপন করা
  • কোন ঋণখত, হুন্ডি বা দাবিনামা গ্রহনীয় বা পরিশোধিত না হয়ে প্রত্যাখ্যাত হলে অথবা অধিকতর নিরাপত্তা বিধানের জন্য প্রতিবাদ লিপিবদ্ধ করা অথবা প্রতিবাদ জানানো, নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৮১ এর আওতায় Acts of Honour প্রস্ত্তত করা অথবা এসব নোট বা প্রতিবাদের নোটিশ প্রেরণ ,
  • জাহাজের প্রতিবাদ, নৌকার প্রতিবাদ অথবা ক্ষয়ক্ষতি অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয় সংশ্লিষ্ট বিষয় নোট করা এবং খসড়া প্রণয়ন।
  • শপথ পরিচালনা করা অথবা এফিডেভিট নেওয়া
  • বটম্‌রি এবং রেসপনডেনটিয়া বন্ড (bottomry and respondantia bonds), চার্টার পার্টি এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক দলিলাদি প্রস্তুত করা
  • বাংলাদেশের বাইরে যে কোন জায়গায় কার্যকর হবে এমন উদ্দেশ্যে কোন দলিল এমনভাবে তৈরি, সত্যায়ন ও প্রমাণীকৃত করা যেন তা ভাষায় এবং সেখানকার আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়
  • এক ভাষা থেকে অন্য ভাষাতে অনুবাদ করা এবং অনুবাদের যথার্থতা যাচাই করা
  • নির্দেশনা সাপেক্ষে অন্য কোন কাজ সম্পাদন

গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে ডকুমেন্ট উপস্থাপন করতে হলে সাধারণত নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সত্যায়িত করে জমা দিতে হয়। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই সত্যায়িত করা বাধ্যতামূলক। জমিজমা সংক্রান্ত দলিল-দস্তাবেজ, হলফনামা, বিবাহবিচ্ছেদ, গাড়ি বেচাকেনা, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র, চারিত্রিক সনদপত্র, জন্ম-মৃত্যুর সনদপত্র এবং বিদেশে নাগরিকত্বের জন্য আবেদনের ক্ষেত্রে নোটারি পাবলিক দিয়ে সত্যায়িত করা বাধ্যতামূলক।

যেভাবে নোটারী করতে হয়ঃ-

নোটারি পাবলিক করতে গেলে আইনজীবী আপনার মূল কাগজপত্র যাচাই করে দেখবেন। এরপর তিনি নিশ্চিত হলে তা সত্যায়িত করবেন। মূল কাগজপত্র বলতে বোঝানো হচ্ছে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, জন্ম ও মৃত্যুর সনদ, চারিত্রিক সনদ ইত্যাদি। আর আপনি যদি বিয়ে, তালাক কিংবা হলফনামা তৈরি করতে চান তাহলে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে আপনার নোটারি করতে হবে। নোটারি বিধিমালা (৬০ক) অনুযায়ী, একজন নোটারিয়ান বা যিনি নোটারি করে দেন তাঁর নির্দিষ্ট কার্যালয় থাকতে হবে। আর নোটারি করার সাইনবোর্ড কার্যালয় ছাড়া অন্য কোথাও ঝোলানো যাবে না।

নোটারি করতে খরচঃ-

নোটারি পাবলিক করার জন্য সরকারের নির্ধারিত ফি রয়েছে। সরকার নির্ধারিত ফি সত্যায়নের কাজে ১০ টাকা, আর যেকোনো স্ট্যাম্পে হলফনামা, চুক্তিপত্রের ক্ষেত্রে ২০-২৫ টাকা খরচ হয়।

প্রতারণা থেকে সাবধানঃ-

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নোটারির কাজ করা হয়। নিয়মানুযায়ী কাগজপত্র নোটারি করার সময় আপনাকে নিজে আইনজীবীর সামনে উপস্থিত থাকতে হবে। অনেক সময় প্রার্থীর অনুপস্থিতিতে নোটারির কাজ সম্পাদন ও ভুয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে নোটারি করা হয়। অনেকে অবৈধভবে নিজেরাই সিলমোহর বানিয়ে প্রতারিত করে থাকেন। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া মারা গেছেন এমন নোটারি পাবলিকের সিলমোহর ব্যবহার করেও অনেকে প্রতারিত করতে পারেন। বয়সের মিথ্যা তথ্য দেওয়া সনদ, বিবাহবিচ্ছেদ ও মামলার কাজে মিথ্যা হলফনামা, পেছনের তারিখে দলিল তৈরি, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত বানিয়ে আমমোক্তারনামা বানানো, মিথ্যা চুক্তিপত্র, ভুয়া আপসনামাসহ বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা সনদ এবং দলিল সম্পাদনার কাজ করছেন এক শ্রেণীর অবৈধ নোটারি পাবলিক। ভুয়া নোটারিরা অনেক ক্ষেত্রে সাদা কাগজে নোটারির কাজ সম্পন্ন করে অপরাধী চক্রকে বিভিন্নভাবে অপরাধ করতে সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অতএব নোটারি করার আগে নোটারি পাবলিক সম্পর্কে ভালো করে জেনে নেওয়া উচিত।

সুত্রঃ অনলাইন