নাম: আম্বিয়া খাতুন
বয়স: ৬০ বছর
স্বামী: রমজান আলী মণ্ডল
পিতা: মৃত. আফজেল পরামানিক
মাতা: জোমেলা খাতুন
গ্রাম: খাদিমপুর
ইউনিয়ন: বহলবাড়িয়া
উপজেলা: মিরপুর
জেলা: কুষ্টিয়া
আম্বিয়া বিয়ের পরপরই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি পড়েন। মনের একাগ্রতা আর পরিবার-সমাজের অনিয়মকে পায়ে পিষে শুরু করেন নতুন সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের শুরু থেকে এখনও লড়ে যাচ্ছেন। তিনি কর্মজীবী নারী’র খাদিমপুর বিশ্বাস পাড়া ১৬ নং নারীকৃষিশ্রমিক সেলের সদস্য।

বাবা মা’র অভাবের সংসারে লেখাপড়া করার সুযোগ পাননি। ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয় এবং দুই সন্তানের মা হন। হঠাৎ একদিন স্বামী গাড়ি দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যায় ফলে আম্বিয়ার একার পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে এই অবস্থায় তাদের সবাইকে শ্বশুড় বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। স্বামী অসুস্থ, তাই আম্বিয়াকেই সংসার চালানোর দায়িত্ব নিতে হয়। অনেক কষ্টে খেয়ে না খেয়ে স্বামীর চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করেন। এরপরে শ্বশুরের হাত পা ধরে তিনি এক কাঠা জমি নিয়ে এক অংশে একটা এক চালা ঘর উঠান। বাকিঅংশে শাকসব্জি লাগান এবং অন্যের জমিতে কৃষিমজুরির কাজ শুরু করেন।

অনেক চেষ্টার পরও সংসারে অভাব লেগেই থাকে। অভাব দূর করার জন্য আম্বিয়া অন্যের কিছু জমি লিজ নেন। মাঠে নেমে ধান ও শাকসব্জি আবাদ শুরু করেন। তার মত মহিলাকে মাঠে কাজ করতে দেখে এলাকার মানুষ ছি ছি করতে থাকে। মহিলা বলে মালিক মজুির কম দেয়। আম্বিয়া বলেন, “আমি মি মানুষ বলে সবসময় বৈষম্যের শিকার হই। যখন অন্যের জমিতে কাজ করি তখন কম মজুরিতে কাজ করতে হয়। যখন নিজের জমিতে কৃষিশ্রমিক দিয়ে কাজ করাই তখন বেশি দামে শ্রমিক নিতে হয়। ফসল ফলাতে গিয়ে আমাকে বেশি দামে সার বীজ কিনতে হয়। ভ্যান খরচও আমার কাছ থেকে বেশি নেওয়া হয়।” আম্বিয়া এ সব কিছু সহ্য করে শত বাধা বিপত্তির মধ্যেও তার কাজ অব্যাহত রাখে। তিনি আরও জমি লিজ নেন এবং অন্য কৃষিশ্রমিকের সাহায্য নিয়ে ধান, শাকসব্জি ছাড়াও ছোলা, মটর, আখ, তামাক, কাউন ইত্যাদি আবাদ করেন। এরমধ্যে কিছু হাঁস-মুরগী ও ছাগল কিনেন এবং তা পালতে থাকেন। আর অবসরে পাটি বোনার কাজ করেন।

এভাবে হাড়ভাঙা খাটুনির মাধ্যমে আম্বিয়া কিছু কিছু টাকা সঞ্চয় করেন এবং তিন বিঘা জমি কেনার উদ্যোগ নেন। কিন্তু সেখানেও আসে বাঁধা। মহিলা বলে শুধু তার নামে জমি ক্রয়ে সামাজিকভাবে নানা আপত্তি আসতে থাকে। তার মতে, “আমার খাটনির টাকায় সামান্য ভূঁই কিনছি। আমি মেয়ে মানুষ সম্পত্তি আমার নামে থাকবে কেন, সমাজের দশেরই মতে আমি আমার কেনা জমির দুই বিঘা স্বামীর নামে লিখে দেই এবং এক বিঘা আমার নামে করি।” বর্তমানে আম্বিয়া এই তিন বিঘা জমিতে একাই পরিশ্রম করছেন।

কর্মজীবী নারীর সাথে কাজ করে তিনি তার জীবনসংগ্রামের এই দিকগুলো সবার সাথে আলোচনা করতে পারেন এবং তার লাঞ্ছনা-বঞ্চনার কারণ বুঝতে পারেন। আর মতে, “আমি আর বঞ্চিত হতে চাই না। আমি নারী কৃষক হিসেবে এবং নারী কৃষিশ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি চাই। সরকারের সাহায্য চাই।”

কর্মজীবী নারী, সিজিসি ও সিএসআরএল কর্তৃক ৩ মার্চ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত কিষাণী শুনানীতে কুষ্টিয়া জেলার খাদিমপুর বিশ্বাস পাড়ার আম্বিয়া খাতুনের সংগ্রামী জীবন ও কৃষিতে তার নিরলস সংগ্রামের কথা শোনেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মস্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আম্বিয়ার জীবন কাহিনী যেন দেশের অপরাপর নারী কৃষিশ্রমিকেরই প্রতিচ্ছবি। তার জীবন সংগ্রামের এই কাহিনী তুলে ধরার জন্য মাননীয় প্রতিমন্ত্রী তাকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মস্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত আন্তর্জাতিক নারী দিবসের জাতীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে তৃণমূল পর্যায়ের ৬ জন নারী তাদের অভিজ্ঞতা ও অর্জনের কথা শোনান। আম্বিয়া খাতুন তাদের একজন।

“আমি মি মানুষ বলে সবসময় বৈষম্যের শিকার হই। যখন অন্যের জমিতে কাজ করি তখন কম মজুরিতে কাজ করতে হয়। যখন নিজের জমিতে কৃষিশ্রমিক দিয়ে কাজ করাই তখন বেশি দামে শ্রমিক নিতে হয়। ফসল ফলাতে গিয়ে আমাকে বেশি দামে সার বীজ কিনতে হয়। ভ্যান খরচও আমার কাছ থেকে বেশি নেওয়া হয়।”