কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে পড়ুয়া ছাত্রী নুরুন্নাহার চুমকি (ছদ্মনাম)। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ঢাকার বনানীতে বসবাসরত একজনের সঙ্গে। ২০১২ সালের ২৯ অক্টোবর বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হন। তাদের বিয়েতে দেনমোহরানার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ১ টাকা। তালাকের সময় দেনমোহরানার উল্লিখিত টাকা দেয়ার কথা থাকলেও, সীমাবদ্ধতার অজুহাতে ৩০ দিন সময় চেয়ে নেয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রকম তালবাহানা শুরু করে। তালাকপ্রাপ্তা চুমকি লোকলজ্জার ভয়ে আদালতের বারান্দায় যেতে চায় না। ব্যক্তিগত কথাগুলো যাতে মানুষের মুখে মুখে রটে না যায়, এমন ভয়ে নিজের অধিকারও চাইতে পারেননি। তাই সমস্যার বিকল্প পদ্ধতিতে সমাধানের জন্য রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু তাতে সে প্রাপ্য অধিকারটুকু অর্জন করতেও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক প্রদানের পর স্ত্রী যেই আদালতের এলাকায় বসবাস করেন ওই আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। মোজাহেদুল ইসলাম বনাম রওশন আরা (২২ ডি.এল.আর, পৃষ্ঠা-৬৭৭) মামলায় বলা হয়েছে, দেনমোহর কখনই মাফ হয় না। স্বামী যদি মারাও যায় তবে সে স্বামীর সম্পদ হতে দেনমোহর আদায় করা যায়। কেননা ইসলামী আইনে দেনমোহরকে দেনা বলে বিবেচনা করা হয়। দেনমোহরের পরিমাণ যত বেশি হোক না কেন, পক্ষগুলোর মধ্যে স্বীকৃত হলে স্বামী তা সম্পূর্ণরূপে স্ত্রীকে পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে।

আরেকটি কেস ষ্টাডিতে দেখা যায়, রুমী নামের একটি মেয়ের বিয়ের দুই দিনের মাথায় স্বামীর সাথে তালাক হয়ে যায়। দেনমোহরের মামলায় কাবিননামায় যে পরিমাণ অর্থ উল্লেখ ছিল সে পরিমাণ অর্থ স্ত্রী দাবি করে ওই স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে। ওই মামলায় স্বামী অর্থাৎ মামলায় যিনি বিবাদীপক্ষ তিনি দাবি তোলেন যে, কাবিননামায় উল্লিখিত অর্থের পরিমাণ ঠিক নয়। বিবাদী পক্ষ উক্ত মামলার জবাবে দম্পতির সহবাস সংগঠনের আগে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবী করে সাকুল্য মোহরানার অর্ধেক পরিশোধ করতে রাজী হয়। এক্ষেত্রে যদি স্বামী সমুদয় অংশ প্রদান করেন তবে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সহবাস যদি হয়ে থাকে, তবে স্বামী সমুদয় মোহরানার টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য। তবে বলে রাখা উচিত সহবাস হয়েছিল কিনা তা প্রমাণের সম্পূর্ণ দায় বাদীপক্ষের অর্থাৎ স্ত্রীর। অর্থাৎ স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বে স্ত্রীকে তালাক প্রদান করলে স্ত্রী অর্ধেক মোহরানা পাবে। যদি স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বেই মারা যায় তাহলে স্ত্রী সম্পূর্ণ মোহরানা পাবে।

একটি বিষয় সবারই জানা দরকার, এমন কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতি বা যুক্তি নেই, স্ত্রী তার স্বামীর নিকট নিজেকে সমর্পণ করলে বা মৌখিকভাবে স্বামী কর্তৃক মাফ চাওয়ার পর মাফ শব্দটি উচ্চারণ করলে আশু দেনমোহরের দাবি নিঃশেষ হয়ে যায়। দেনমোহর স্বামীর ঋণ, যা স্ত্রী চাহিবা মাত্র পরিশোধ করতে হয়। মাহমুদা খাতুন বনাম আবু সাইদ (২১ ডি.এল.আর) মামলায় মহামান্য বিচারপতি যেমনটা বলেছেন‘সহবাসের আগে এবং পরে স্ত্রী স্বামীর কাছে তলবী মোহরানার দাবি করতে পারে এবং স্বামী তলবী দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী তার অধিকারে যেতে অস্বীকার করতে পারেন।’ দেনমোহরের সংজ্ঞা দিতে ডি.এফ মোল্লা বলেন, মোহর বা মোহরানা হলো কিছু টাকা বা অন্য কিছু সম্পত্তি যা বিবাহের প্রতিদান স্বরুপ স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে পাবার অধিকারী। মোহরানা স্ত্রীর সন্মানের প্রতীক।

সুতরাং বিয়ের আসরে বা অনুষ্ঠানে স্বামী তার স্ত্রীকে মর্যাদা স্বরুপ যে অর্থ বা সম্পদ দেয় বা দেবার অঙ্গীকার করে তাকে দেনমোহর বলে। দেনমোহর স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকার এবং এটা স্বামীর কাছে স্ত্রীর প্রাপ্য। বিয়েতে যদি দেনমোহর নির্ধারণ করা না হয়, তবে স্ত্রী তার মর্যাদা ও যোগ্যতার বিচারে দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী। স্বামী এহেন মোহরানা পরিশোধ ব্যতীত দাম্পত্য অধিকারের ডিক্রি পেতে পারে না। যে কোন বিষয় সম্পত্তি মোহরানার জন্য ধার্য করা যায় না। ইহা হতে পারে নগদ অর্থ, কোন বীমা পলিসি বা অন্য কোন দ্রব্য সামগ্রী। তবে কোন হারাম বস্তু হতে পারবে না। স্বামীর দখলে নেই এমন কোন সম্পত্তি পারে না। ভবিষ্যত কোন বিষয়ও এর অন্তর্ভূক্ত হতে পারবে না।

দেনমোহর নির্ধারণ পদ্ধতি

মোহরানার পরিমান সুনির্দিষ্টভাবে বেঁধে দেয়া হয়নি। তাই তা আপেক্ষিক। অর্থাৎ বর ও কণের উভয়ের দিক বিবেচনান্তে তা নির্ধারিত হয়। দেনমোহর কত হবে তা নির্ণয়কালে স্ত্রীর পিতার পরিবারের অন্যান্য মহিলা সদস্যদের ক্ষেত্রে যেমন স্ত্রীর বোন, খালা, ফুফুদের ক্ষেত্রে দেনমোহরের পরিমাণ কত ছিল তা বিবেচনা করা হয়। তাছাড়া স্ত্রীর পিতার আর্থ-সামাজিক অবস্থান, ব্যক্তিগত যোগ্যতা, বংশ মর্যাদা, পারিবারিক অবস্থা ইত্যাদির ভিত্তিতে দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। অপর দিকে বরের আর্থিক ক্ষমতার দিকটাও বিবেচনায় রাখা হয়। এসব দিক বিচার বিবেচনা করেই মূলতঃ দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়। উল্লেখ্য, দেনমোহর একবার নির্ধারণ করার পর এর পরিমাণ কমানো যায় না, তবে স্বামী ইচ্ছা করলে তা বাড়াতে পারেন।

হযরত মুহাম্মদ (স.) তার প্রত্যেক স্ত্রীকে মোহর বা মহরানা প্রদান করেন এবং তাদেরকে দাস বৃত্তি থেকে স্বাধীন করে দেন। তিনি তাঁর অন্যতম স্ত্রী উম্মে হাবিবাকে ৪ হাজার দিরহাম মোহর দিয়েছিলেন। এই মোহর নাকি নির্ধারন করেছিলেন তৎকালীন আবিসিনিয়ার স¤্রাট নাযাশি (আবু দাউদ , ‘কিতাব এন নিকাহ’২:২৩৫)। মোহরের সর্বোচ্চ পরিমান কত হবে, তা কখনোই নির্ধারিত করা হয়নি। স্বামীর অর্থনৈতিক যোগ্যতা, অবস্থা ভেদে এটি নির্ধারিত হতো। এ বিষয়ে একটি দৃষ্টান্ত মূলক ঘটনার নজীর রয়েছে। দ্বিতীয় খলিফা ওমর বিন খাতাব (উল্লেখ্য খলিফা ওমরকে ইসলামের সকল মাহজাবের অনুসারীরা একরকমভাবে গ্রহন করেন না) তার ভক্ত সমাবেশে ঘোষণা দেন, নসিহত করেন যে,‘ কেউ খুব ভারী ও বিপুল রকমের মোহর নির্ধারন করবেন না। কারন নবীজী মুহাম্মদ চার’শ দিরহামের বেশি পরিমান মোহর কাউকে দিতে বারন করেছেন।’ তৎক্ষণাৎ এ কথার প্রতিবাদ জানান ওই সমাবেশে আগত এক নারী। তিনি কোরাণের ৪:২০ সুরা ও আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরে বলেন,“ তুমি যদি একজনের পরিবর্তে অন্য একজনকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহন করো এবং যদি প্রথম স্ত্রীকে মোহরানা হিসাবে কয়েক রাশি স্বর্নমুদ্রাও দাও, তাহলে তার একতিল পরিমানও তুমি সাবেক স্ত্রীর কাছ থেকে ফেরত নিতে পারবে না। খলিফা ওমর সঙ্গে সঙ্গে নিজের কথাটি প্রত্যাহার করে ওই নারীর বক্তব্যটিকে সঠিক বলে মন্তব্য করেন ‘যিনি যে পরিমান মোহর দিতে চান তিনি সে পরিমানই দিতে পারবেন’(ইবনে হযর আল-আথকালানি,ফাত আল-বারী, ৯:১৬৭”)।

বিয়ের সময় দেনমোহর নির্ধারণ না হলেঃ

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারা মোতাবেক দেনমোহর প্রদানের পদ্ধতি সম্পর্কে কাবিনে বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলেও স্ত্রী চাহিবামাত্র সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করতে হবে। বিয়ের সময় যদি দেনমোহর নির্ধারণ করা না হয় এমনকি স্ত্রী পরবর্তীতে কোন দেনমোহর দাবী করবে না এ শর্তে বিয়ে হয় তাহলেও স্ত্রীকে উপযুক্ত দেনমোহর দিতে হবে। কোন বিবাহে দেনমোহরের কথা না থাকলেও আইন স্ত্রীকে দেনমোহরের অধিকার দেয়। স্ত্রীর প্রতি মর্যাদার চিহ্নস্বরূপ স্বামীর উপর ইসলামী আইন এ দায়িত্ব অর্পন করেছেন। ইসলামে বিবাহের মর্যাদার চিহ্নস্বরূপ মোহরানা একটি আবশ্যিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, বিবাহের সময় এটা নির্ধারিত না থাকলেও আইনতঃ পরবর্তী কালে এটা নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে।

দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারিত থাকলেও এর কোন সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ নেই। তবে দেনমোহরের পরিমাণ বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করার সময়ে বা বিয়ের আসরে নির্ধারণ করতে হবে। তবে সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হল বিয়ের দিন নির্ধারণ করার পূর্বে উভয় পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে ধার্য্য করা। বর নিজেই এ চুক্তি করতে পারে। এই দেনমোহর দাম্পত্য মিলন, তালাক-বিচ্ছেদ অথবা স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর দ্বারা নিশ্চিত হয়।

দেনমোহর ছাড়া বিয়ে বাতিল হয় না, বৈধই থাকে তবে শর্ত থাকে বিয়ের পর অবশ্যই উপযুক্ত দেনমোহর দিতে হবে। মোহরানা হল মুসলিম বিবাহের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং এটা যদি বিবাহের সময় অনির্ধারিত থাকে, তবে তা অবশ্যই কোন স্পষ্ট নীতিমালা দ্বারা নির্ধারণ করতে হবে।

উদাহরণ:

হাসান ও রহিমার বিয়ের সময় দেনমোহর ধার্য করা হয়নি। রহিমার বড় বোন ও ফুফুর দেনমোহরের পরিমাণ ছিলো ত্রিশ হাজার টাকা। সুতরাং ত্রিশ হাজার টাকা বা তার কাছাকাছি পরিমাণ দেনমোহর বিয়েতে নির্ধারণ করতে হবে।

স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে কিংবা তালাক হলেঃ

স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রীর সম্পূর্ন দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে হবে। তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর আগেই স্ত্রী দেনমোহর দাবি করতে পারে এবং স্বামী তখন নির্ধারিত দেনমোহর পরিশোধ করতে বাধ্য। দেনমোহর স্ত্রীর কাছে স্বামীর ঋণ তাই যে কোনো সময় স্ত্রী তা দাবি করতে পারে।

দেনমোহর চেয়ে না পেলে সেক্ষেত্রে স্ত্রীর করণীয়ঃ

যদি কোনো স্ত্রী স্বামীর কাছে নির্ধারিত দেনমোহর চেয়ে না পায়, তবে সেই স্ত্রী নিম্নলিখিত কাজগুলো করতে পারে। যেমন-

১। স্বামীর সাথে বসবাস করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে
২। দাম্পত্য মিলনে অনীহা প্রকাশ করতে পারে
৩। এমন কি সে দূরে বসবাস করতে পারে।
এ সময় স্বামী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে৷ কোন স্বামী যদি দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য মামলা করে, তবে তার মামলা খারিজ হয়ে যাবে, কারণ স্বামী, স্ত্রীর দাবি অনুযায়ী দেনমোহর পরিশোধ করেনি।

উদাহরণ:

হালিমা, কাসেমের স্ত্রী। বিয়ের পাঁচ বছর পর হালিমা তার প্রাপ্য দেনমোহর দাবি করলো। কিন্তু কাসেম তা দিতে অস্বীকার করে। সে ক্ষেত্রে হালিমা কাসেমের কাছ থেকে দূরে অন্যত্র বসবাস করতে পারবে এবং কাশেম তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।

স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর দেনমোহর আদায়ঃ

স্বামীর মৃত্যুর পর দেনমোহর স্ত্রীর কাছে স্বামীর ঋণ হিসেবে ধরা হবে। অন্যান্য ঋণের মতোই এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। দাফন-কাফনের খরচ করার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি থেকে দেনমোহর ও অন্যান্য ঋণ পরিশোধ করতে হবে, এমন কি এই ঋণ পরিশোধ না করলে স্ত্রী স্বামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে দেনমোহরের জন্য মামলাও করতে পারে। স্বামীর আগে স্ত্রীর মুত্যু হলেও দেনমোহর দিতে হবে। এক্ষেত্রে স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা এই দেনমোহর পাবার অধিকারী। তারা দেনমোহর পাবার জন্য মামলাও করতে পারে।

স্বামী স্ত্রীকে কোনো উপহার দিলে তা দেনমোহর বলে বিবেচিত হবে কি-না

স্বামী স্ত্রীকে কোন কিছু উপহার হিসেবে দিলে তা অবশ্যই দেনমোহর নয়। বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীকে অনেক কিছুই দিতে পারে। স্বামী যদি দেনমোহর হিসেবে স্ত্রীকে কিছু দেয়, তবেই তা দেনমোহর বলে বিবেচিত হবে। এক্ষেত্রে “দেনমোহর বাবদ” কথাটি লেখা থাকতে হবে।

যেমন: জমি হস্তান্তর দলিলে “দেনমোহর বাবদ” কথাটি লেখা না থাকলে এরূপ জমি-দেনমোহর হিসেবে ধরা হবে না।

তবে মোহরানার পরিবর্তে হিবা বিল এওয়াজের রীতিও রয়েছে। ১৯৫৫ সালে ঢাকা হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, মোহরানার পরিবর্তে হিবা-বিল-এওয়াজ তখনই বৈধ হবে যখন স্ত্রী কোন প্রতিদান ছাড়াই স্বামীকে মোহরানা দান করে দেয় এবং পরে স্বামী স্ত্রীর দানের “এওয়াজ” স্বরূপ কোন সম্পত্তি আলাদাভাবে দান করে, কারন এটা মুসলিম আইনে একটি বিশুদ্ধ হিবা বিল এওয়াজ হবে। এমনকি যদি স্বামী স্ত্রীকে কোন কিছু দান করেন এবং স্ত্রী স্বামীর বরাবরে প্রতিদান স্বরূপ অন্য কোন দলিল মূল্যে মহরানার অধিকার ছেড়ে দেয় তবে উহা আধুনিক প্রকৃতির একটি হিবা বিল এওয়াজ বলে গন্য হবে, পিএলডি (১৯৫৫, ঢাকা. পৃষ্ঠা ৩৯)।

উদাহরণঃ

কাসেম বিয়ের পর হালিমাকে এক বিঘা জমির মালিকানা হস্তান্তর করে এবং এটি উপহার হিসেবে হালিমাকে প্রদান করে। তাদের মধ্যে তালাক হয়ে যাবার পর হালিমার প্রাপ্য দেনমোহর দিতে কাসেম অস্বীকার করে এবং বলে যে ঐ জমিটি সে হালিমাকে দেনমোহর হিসেবে দিয়েছে। জমির দাম দেনমোহরের পরিমাণের চেয়ে বেশি হলেও এটি দেনমোহর হিসেবে ধরা হবে না। কারণ কাসেম হালিমাকে জমি উপহার হিসেবে দিয়েছিল। হালিমা পুরো দেনমোহর পাবার অধিকারী হবে। যদি সে সময়েই কাশেম উল্লেখ করে দিত যে, জমিটি দেনমোহর হিসেবে দেয়া হচ্ছে, তবেই হালিমা পরবর্তীতে আলাদাভাবে দেনমোহর চাইতে পারতো না। বিয়ের সময়ে দেয়া শাড়ী, গয়না ইত্যাদি কখনো দেনমোহরের অংশ হিসাবে বিবেচিত হবেনা৷ অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের সময় গয়না, শাড়ি ইত্যাদির মূল্য দেনমোহরের একটি অংশ ধরে উসুল লিখে নেয়া হয়। আসলে বিয়েতে দেয়া উপহার বা উপঢৌকন দেনমোহর নয়। এগুলোকে দেনমোহরের অংশ বলে ধরা যাবে না এবং উসুল বলা যাবে না।

ভরণপোষণ দেনমোহর বলে বিবেচিত হবে নাঃ

দেনমোহরের সাথে ভরণপোষণের কোন সম্পর্ক নেই। বিবাহিত অবস্থায় স্ত্রীকে ভরনপোষনের জন্য স্বামীর যে খরচ তা কোনভাবেই দেনমোহরের অংশ বলে বিবেচিত হবে না। আবার বিয়ে-বিচ্ছেদের ফলে স্বামী, স্ত্রীকে যে ভরণপোষণ দেয় তাও দেনমোহরের অংশ নয়। দেনমোহর এবং ভরণপোষণ দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। একটি পরিশোধ করলে অপরটি মাফ হয়ে যায় না।

দেনমোহর কখনো মাফ হয় নাঃ

স্ত্রী দেনমোহর মাফ করতে পারে। যদিও স্বামী চাইল আর স্ত্রী সাথে সাথে তা মাফ করে দিলো, বিষয়টা এত সহজ নয়। সহজে দেনমোহর মাফ হয় না। দেনমোহর মাফ করার সময় স্ত্রীর পূর্ণ সম্মতি থাকতে হবে। একই সাথে তাকে স্বেচ্ছায়, কোন রকম প্ররোচণা ছাড়া মুক্তমনে দেনমোহর মাফ করতে হবে। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একটি সিদ্ধান্তে বলা হয়, দেনমোহর যদি স্বামী শোধ না করেন তাহলে তার ফল দাঁড়ায় যে যতক্ষণ না পর্যন্ত তা শোধ করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রী স্বামীর নিকট থেকে দূরে থাকতে পারবেন (৯ ডিএল আর)। শুধু তাই নয় দূরে থাকার পরেও স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য (১১ ডি এল আর)। উচ্চ আদালতের আরো সিদ্ধান্ত রয়েছে যে ,এ অবস্থায় স্বামী দাম্পত্য স্বত্ব পুনরুদ্ধারের মামলায় ডিক্রি পেতে পারেন না। পাকিস্তান ল ডাইজেস্ট (১৯৫৯) লাহোর এর ৭১০ পৃষ্ঠায় সন্নিবেশিত করা হয়েছে যে স্ত্রীকে মোহরানা দেয়া হয়েছে কিনা যিনি তা পরিশোধ করেছেন তাকেই তা প্রমান করতে হবে।

দেনমোহরের অংশ

দেনমোহরের দুটো অংশ যথাক্রমে (১) মুয়াজ্জল (আশু) দেনমোহর (২) মু-অজ্জল (বিলম্বিত) দেনমোহর।
ক) মুয়াজ্জল বা আশু দেনমোহর হচ্ছে, নগদে স্ত্রীকে প্রদান করা অর্থাৎ বিয়ের আসরে দিতে হয়। বিয়ের আসরে না দিতে পারলে পারিবারিক জীবন চলাকালীন সময়ে দেনমোহরের যে অংশটুকু স্ত্রী চাহিবামাত্র স্বামী পরিশোধ করতে বাধ্য থাকে।
খ) মু-অজ্জল বা বিলম্বিত দেনমোহর হচ্ছে, দেনমোহরের যে অংশটুকু স্বামীর মৃত্যুর পর কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদ বা তালাকের পর স্ত্রী পেয়ে থাকে। আরও পরিস্কার করে বলা যায় যে, আইন অনুযায়ী কেবলমাত্র দুইটি পরিস্থিতিতে বিলম্বিত মোহরানা স্ত্রী দাবি করতে পারেন। একটি হচ্ছে যদি স্বামীর মৃত্যু হয় অথবা তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙ্গ যায়। অপরটি হচ্ছে, যদি স্বামী সালিসি পরিষদ অথবা স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহন করেন। দেনমোহর কেনো স্ত্রীর ভরণপোষন নয়। এটি বিয়ের পর স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদত্ত কোনো উপহারও নয়। বরং বিয়ের সময় স্বামীর কাবিননামায় প্রতিশ্রুত অর্থ। যা স্বামী কোনো ভাবেই উপেক্ষা করতে পারেন না।

“আর তোমরা নারীদেরকে তাদের দেন মোহর খুশিমনে দিয়ে দাও। যদি তারা খুশি মনে তার কিছু ছেড়ে দেয় তোমরা তা স্বচ্ছন্দে ভোগ কর”.সুরা নিসা।

এ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, আইন গ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক দৈনিক ‘সময়ের দিগন্ত’।