মানুষ আইন তৈরি করেছে সমাজের ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে সীমারেখা টানতে। কোনো মানুষের ক্ষতি করে এমন কোনো কাজ যাতে কেউ না করে তার জন্য তৈরি হয়েছে বিচার ব্যবস্থা। কিন্তু ইতিহাসের এমন অসংখ্য ঘটনা আছে যেখানে বিচার ব্যবস্থা পুতুলের ন্যয় অত্যাচারী শাসকের আঙুলের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। আবার কখনও আদালত বিচার করবার সময় পালন করেছে দুর্বল ভূমিকা, আশ্রয় নিয়েছে দুর্বল যুক্তির। যত যুক্তিই থাকুক না কেন, আদালতের বিচারের মাধ্যমে যদি একজন নিরপরাধ মানুষও সাজা পায় তবে সেটা আইনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়।

যীশু খ্রিস্ট, সক্রেটিসের মত ইতিহাসে এমন জানা-অজানা অনেক মানুষ নির্দোষ হওয়া স্বত্বেও বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয়েছেন। কখনও পরবর্তীতে তাদেরকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে, কখনও বা সেই স্বীকারোক্তিও মিলে নি। ইতিহাস ও আইনের বিচারের পাঠ্যে উল্লেখযোগ্য এমন কিছু ঘটনা আজ তুলে ধরা হল যেখানে বিচারের মাধ্যমে সাজা দেয়া হয়েছে নিরপরাধ মানুষকে।

উইলিয়াম জ্যাকসন ম্যারিয়ন

১৮৭২ সালে দুই বন্ধু উইলিয়াম জ্যাকসন ম্যারিয়ন ও জন ক্যামেরন নেব্রাস্কার লিবার্টি থেকে কাজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিছুদিন পর ম্যারিয়ন লিবার্টির কাছাকাছি তার শাশুড়ির বাসায় আসে, সাথে ছিল ক্যামেরনের ঘোড়াগুলো। ম্যারিওনের শাশুড়ি সন্দেহ করে সে তার বন্ধুকে মেরে ঘোড়াগুলো হাতিয়ে নিয়েছে। এরপর ম্যারিয়ন নেব্রাস্কা ছেড়ে যায়। পরের বছর নেব্রাস্কাতে একটা কঙ্কাল পাওয়া যায় যার গায়ে জড়ানো পোশাক দেখে কেউ কেউ সাক্ষ্য দেয় সেটা ক্যামেরনের লাশ বলে। ম্যারিয়নকে সন্দেহভাজন ঘোষণা করে খুঁজতে থাকে পুলিশ।

নয় বছর পর পুলিশ খুঁজে পায় ম্যারিয়নকে সে  আছে ক্যানসাসের একটি জেলে যেখানে সে চুরির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিল। সেখান থেকে ম্যারিয়নকে নিয়ে যাওয়া হয় নেব্রাস্কাতে এবং ক্যামেরনকে হত্যার দায়ে তার বিচার শুরু হয়। দুই মাস বিচারকাজের পর একজন বিচারক তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আপিল করে ম্যারিয়ন। সে বারবার বলে ঘোড়াগুলো ক্যামেরন তার কাছে বিক্রি করে চলে গিয়েছিল এবং সে বন্ধুকে খুন করে নি। কিন্তু আপিলের পর জুরির বিচারকেরা ম্যারিয়নকে খুনি সাব্যস্ত করে আবার মৃত্যুদণ্ডই বহাল রাখে। ১৮৮৭ সালে নেব্রাস্কাতে ম্যারিয়নের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সে বছর ওমাহা ডেইলি বি নামক পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, “ম্যারিয়ন যে অপরাধী সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই এবং সেখানকার ইন্ডিয়ান এলাকাগুলোর খুনের জন্যও সে-ই দায়ী।”

ম্যারিয়নের মৃত্যুর চার বছর পর ১৮৯১ সালে নেব্রাস্কাতে হাজির হয় জন ক্যামেরন। ফিরে আসার পর সে জানায়, তার ‘মৃতদেহ’ উদ্ধারের সময় থেকে এই প্রায় বিশ বছরে সে ঘুরে বেড়িয়েছে মেক্সিকো, আলাস্কা ও কলোরাডোতে। বিশ বছর আগে তার কোনো এক প্রেমিকার বাচ্চার পিতা হবার ‘দায়’ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে পালিয়ে গিয়েছিল। যাবার আগে ম্যারিয়নের কাছে সে তার ঘোড়াগুলো বিক্রি করে দেয় এবং ম্যারিয়নের দেয়া নোটগুলোর একটি এই বিশ বছর ধরে সে রেখে দিয়েছিল স্মৃতি হিসেবে।

১৯৮৭ সালের মার্চে ম্যারিয়নের মৃত্যুর একশ বছর পর নেব্রাস্কা স্টেট এর পক্ষ থেকে উইলিয়াম ম্যারিয়নকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। আইনের ইতিহাসে নির্দোষ মানুষের অন্যায় বিচারের ঘটনা হিসেবে ম্যারিয়নের মৃত্যুদণ্ড কুখ্যাত হয়ে আছে।

জোয়ান অব আর্ক

জোয়ান অব আর্ক ছিলেন ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত যোদ্ধা। ১৮০৩ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট জোয়ান অব আর্ককে ফ্রান্সের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ঘোষণা করেন। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে ১০৬ বছর ধরে যে ‘শত বছরের যুদ্ধ’ চলেছিল, তারই একটা সময়ে জোয়ান অব আর্ক যুদ্ধ করেছিলেন ফ্রান্সের হয়ে।

জানা যায়, সেইন্ট ও অ্যাঞ্জেলদের স্বপ্নে দেখার কথা বলেছিলেন জোয়ান, যারা তাকে ষষ্ঠ চার্লসকে যুদ্ধে সহায়তা করে ইংল্যান্ডের অধীনস্ততা থেকে ফ্রান্সকে মুক্ত করতে বলেছিলেন। পুরুষের বেশ ধরে যুদ্ধে যান জোয়ান। চার্লস তাকে পাঠান অরলিন্স এ। টানা দেড় বছর ধরে ইংরেজরা যেখানে জিতে চলছিল, সেখানে জোয়ানের আগমনের মাত্র নয় দিনের মাথায় পরাজিত হয় তারা। এরপরে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে সাহসের সাথে লড়াই করে জয় নিয়ে আসেন জোয়ান। জোয়ানের খণ্ডযুদ্ধগুলো জয়ের ঘটনা প্রবল উদ্যম ছড়িয়ে দেয় ফ্রেঞ্চ বাহিনীর মধ্যে।

১৪৩০ সালের মে মাসে ইংরেজদের সহায়তাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যান জোয়ান। ইংরেজদের কাছে তাকে হস্তান্তরের পর তারা তার বিচার শুরু করে। পিয়েরে কশন নামের এক বিশপ ছিল আদালতের বিচারক। কশন জোয়ানের বিরুদ্ধে অনেকগুলো অভিযোগ আনে যার মধ্যে বড় একটি অভিযোগ ছিল জোয়ানের নারী-পুরুষ উভয়ের পোশাক পড়া! বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয় জোয়ানের। ১৪৩১ সালে জোয়ানকে যখন পুড়িয়ে মারা হয় তখন তার বয়স ছিল ১৯ বছর।

১৪৫৬ সালে পোপ তৃতীয় ক্যালিক্সটাস এর নেতৃত্বে গঠিত একটি আদালতে জোয়ানকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়।

সালেম শহরের ‘ডাইনি’রা

১৫ থেকে ১৮ শতকে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল ও এর উপনিবেশগুলোতে জাদুবিদ্যা ব্যবহারের কথিত অভিযোগে আদালতের বিচারের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে অনেক মানুষকে। এই সময়েরই কুখ্যাত এক বিচার ছিল ‘সালেম উইচ ট্রায়াল’ নামে পরিচিত সালেম শহরের জাদুকরদের মারার জন্য গঠিত আদালতের বিচার। সতের শতকের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনাধীন আমেরিকার সালেম শহরে ২০ জন মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় যাদের অপরাধ ছিল কথিত ‘জাদুবিদ্যা’ প্রয়োগ করা। ১৬৯২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬৯৩ এর মে পর্যন্ত ১৬ মাসে আদালত যে ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড দেয় তাদের মধ্যে ছিল ১৪ জন নারী যাদের ডাইনী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। অভিযুক্ত অবস্থাতেই আরও পাঁচজন কারাগারে মারা যায় যাদের মধ্যে দুজন ছিল দুগ্ধপোষ্য শিশু।

হিস্টেরিয়া আক্রান্ত হলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে নানা রকম উদ্ভট আচরণ করতে থাকে, অনেক সময় এটা গণ হিস্টেরিয়া আকারেও দেখা দিতে পারে। তেমন ঘটনাই ঘটেছিল শুরুতে। হিস্টেরিয়া আক্রান্ত দুই শিশুর আচরণের কারণ ধরতে না পেরে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তিন নারীকে এই অভিযোগে যে, তারা ঐ শিশুদের জাদু করেছে। সেখান থেকেই শুরু। একে একে এমন অসুস্থতার জন্য যাদের বিরুদ্ধে জাদু করার অভিযোগ হল তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে লাগল বিশেষ আদালত। জাদুবিদ্যার ব্যাপারে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ি তো ছিলই, সাথে সালেম শহরের অধিবাসীদের নিজেদের মধ্যকার বিরোধও এখানে ভূমিকা নেয় জাদুকরদের ধরার জন্য। শহরের অধিবাসীরা নিজেদের মধ্যে যাদের সাথে বিরোধ রয়েছে তাদেরকে জাদুকর আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করছিল।

সে সময়কার একজন মন্ত্রী কটন ম্যাথার এবং তার বাবা হার্ভার্ড কলেজের প্রেসিডেন্ট ইনক্রিস ম্যাথার এই বিচারের বিরোধিতা করেন। এক সময় দেখা গেল, এই আদালত অত্যন্ত নির্দয় আচার শুরু করেছে তখন এর প্রতি জনতার সমর্থন ধীরে ধীরে কমতে লাগল। জনসমর্থন কমতে শুরু করায় ১৬৯৩ সালে গভর্নর ফিপস এই বিশেষ আদালত বন্ধ করে দেন এবং বন্দি বাকি অভিযুক্তদের মুক্তি দেন। সালেম শহরের বিচারগুলো উপনিবেশাধীন আমেরিকার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কারণ পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ছিল। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সমাজের উপর চার্চের যে উগ্র ধর্মীয় প্রভাব ও নিষ্ঠুর শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল সেটা ভেঙে যাওয়া শুরু হয়েছিল এই বিচারের পরবর্তী জনতার উপলব্ধি থেকে।

২০০১ সালে সালেম শহরের বিচারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের নির্দোষ ঘোষণা করে আইন পাস করা হয়।

ভিডিওঃ